ইপেপার / প্রিন্ট
দেশে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি আরও কঠোর হয়েছে। এর প্রভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এ জমা পড়া সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন আগের বছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেড়েছে।
বিএফআইইউ-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক প্রতিবেদন জমা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন (এসএআর)।
এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫টি সন্দেহজনক প্রতিবেদন জমা হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজারের বেশি। চার বছর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি প্রতিবেদন জমা হয়েছিল, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিএফআইইউ বলছে, সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বৃদ্ধি, আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠোরতা, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
বিশেষ করে অনলাইন জুয়া, অবৈধ বাজি, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রার অনিয়ম এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব লেনদেন শনাক্তে আরও সক্রিয় হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক থেকে।
এই সময়ে ব্যাংকগুলো ২৮ হাজার ৭৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আগের অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৯৯১টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে সন্দেহজনক প্রতিবেদন বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৮০৯টি। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
বিএফআইইউ-এর মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর ফলে সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তের সক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থার কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় বেশি সতর্কতার সঙ্গে লেনদেন বিশ্লেষণ করছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকের বাইরে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনও বেড়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন ১২১টি থেকে বেড়ে ২৫০টিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন ৯০০টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৫টি।
তবে মোট সন্দেহজনক প্রতিবেদনের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের অংশ এখনও সীমিত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ প্রায় ১ শতাংশ এবং অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের অংশ প্রায় ৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন বৃদ্ধি মানেই সব লেনদেন অপরাধমূলক—এমন নয়। বরং এটি আর্থিক খাতে নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর হওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম শনাক্ত করার সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিএফআইইউ।