ইপেপার / প্রিন্ট
টানা নদীভাঙনে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, ফসলি জমি, কবরস্থান আর জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও। এমন বাস্তবতায় বরিশালের নদীতীরবর্তী মানুষের একটাই আবেদন—নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আজাহার মোল্লা আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে বসে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীরে পাইলে পাও দুইডা ধইরা কইতাম—নদীভাঙন থামান, মোগো বাঁচান। বাপ-দাদার জমি, কবরস্থান সব নদীতে গেছে। এখন বসতভিটাও নদী খাইয়া ফেলবে। আমরা কোথায় যামু?”
আজাহার মোল্লা জানান, বাপ-দাদার রেখে যাওয়া প্রায় সব কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানও রক্ষা করা যায়নি। এখন শেষ সম্বল বসতভিটাটুকুও ভাঙনের মুখে।
একই দুর্ভোগের কথা জানান সিংহেরকাঠী গ্রামের কামাল সরদার। তিনি বলেন, নদীভাঙনের কারণে ইতোমধ্যে পাঁচবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। এখন আর নতুন করে ঘর তোলার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাবুগঞ্জ উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী সিংহেরকাঠী, লোহালিয়া ও রফিয়াদি গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা গত কয়েক বছরে ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। শত শত পরিবার ইতোমধ্যে সর্বস্ব হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে, আর হাজারো মানুষ দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নদীভাঙন শুরু হলেও স্থায়ী প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও নিম্নচাপের প্রভাবে নদীর পানি নামতে শুরু করায় নতুন করে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল হোসেন পুতুল বলেন, গত প্রায় এক দশক ধরে মীরগঞ্জ ফেরিঘাট থেকে ছোট মীরগঞ্জ হয়ে ময়দানেরহাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার জানানো হলেও মাঝে মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলার বাইরে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ১৭টি পরিবার আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত হলেও এখনও শত শত পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বরিশালের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত কীর্তনখোলা, পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, কালাবদরসহ বিভিন্ন নদীর ভাঙনে প্রতিবছর বদলে যাচ্ছে জেলার ভৌগোলিক চিত্র। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসনের অভাবকে ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, পরিকল্পিত নদীশাসন এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে প্রতিবছর আরও অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত পাঁচ থেকে আট বছরে নদীভাঙন প্রতিরোধে অন্তত ১০টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে অধিকাংশই এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থায়ী বাঁধ ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্পের অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে, আগামীকাল (১৩ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে নদীভাঙনকবলিত জনপদের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বাবুগঞ্জ, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও বরিশাল সদরসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা আড়িয়াল খাঁ, মেঘনা, কীর্তনখোলা ও সন্ধ্যা নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।