ইপেপার / প্রিন্ট
দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটির ২০২৫ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, কন্যাশিশুরা দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও আত্মহত্যার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংগঠনের সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান জানান, ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে কন্যাশিশুরা দলবদ্ধ ধর্ষণের ১৪২টি, ধর্ষণের চেষ্টার ১১৭টি এবং আত্মহত্যার ২০৩টি ঘটনায় ভুক্তভোগী হয়েছে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা হত্যার ৭৫৬টি, ধর্ষণের ৩৭৬টি এবং যৌন হয়রানির ১২৫টি ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গৃহিণীরা হত্যার ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ৯৪ শতাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগী। অন্যদিকে শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরা ধর্ষণের চেষ্টার ৮০ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৭ শতাংশ, দলবদ্ধ ধর্ষণের ৩৯ শতাংশ এবং বাল্যবিবাহের শতভাগ ঘটনায় ভুক্তভোগী হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সামাজিক প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তির অন্যতম কারণ। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ছয় বছরের শিশু থেকে ষাটোর্ধ্ব নারী—জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই নারীরা সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে ছয় থেকে নয় বছর বয়সী শিশুকন্যাদের ধর্ষণের ঘটনা বেশি হওয়াকে তিনি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ধর্ষণের জন্য কোনোভাবেই ভুক্তভোগী দায়ী নন; দায়ী অপরাধী এবং সেই সামাজিক মানসিকতা, যা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। একই সঙ্গে ধর্ষণের সঙ্গে হত্যার ঘটনাও বাড়ছে, যা সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শুধু সহিংসতার ঘটনা প্রকাশ করলেই হবে না, এর পেছনের সামাজিক ও কাঠামোগত কারণও তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা বজায় রেখে অপরাধীদের পরিচয় ও জবাবদিহির বিষয়টি দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ধর্ষণ, হত্যা ও এ ধরনের সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ। এসব অপরাধ স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা আইনসম্মত নয়। এ ধরনের উদ্যোগ বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেত্রী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলে