1. numanashulianews@gmail.com : kazi sarmin islam : kazi sarmin islam
  2. islamkazisarmin@gmail.com : newstv : Md newstv
  3. anonnaa5481@gmail.com : newstv2232 :
  4. admin@newstvbangla.com : newstvbangla : Md Didar
২৭ জেলায় রাসেলস ভাইপার, ‘আতঙ্ক’ নয় প্রয়োজন সতর্কতা - NEWSTVBANGLA
শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৪ অপরাহ্ন

২৭ জেলায় রাসেলস ভাইপার, ‘আতঙ্ক’ নয় প্রয়োজন সতর্কতা

প্রতিনিধি

বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে গ্রামীণ ও কৃষিনির্ভর চর এলাকায় রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। তবে সম্প্রতি এর উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ছে। পদ্মা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন জেলায় এটি বেশি দেখা যাচ্ছে এবং মানুষকে দংশনের ঘটনাও ঘটছে। তাই এখন এই সাপ নিয়ে আলোচনা ও আতঙ্ক দুটিই ছড়াচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রকল্প ভেনম রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ২৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপার আছে।

জানা গেছে, অধিক প্রজনন ক্ষমতাসম্পন্ন এই সাপ ডিম না দিয়ে একসঙ্গে ২০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত জীবন্ত বাচ্চা প্রসব করতে পারে। ফলে খুব সহজে এসব বাচ্চা বন্যার পানির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। পরবর্তীতে পূর্ণবয়স্ক হয়ে আবারও বংশবিস্তার করছে।

দেশের চরাঞ্চল এবং নদীর তীরবর্তী লোকালয়ে রাসেলস ভাইপারের উপদ্রব বৃদ্ধি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কৃষির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে রাসেলস ভাইপার আতঙ্ক।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রাসেলস ভাইপার নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। রাসেলস ভাইপার কামড়ালেই ‘মৃত্যু নিশ্চিত’ বলে প্রচার করা হচ্ছে। ফলে এ নিয়ে আতঙ্ক দিন দিন বাড়ছে।

কিন্তু চিকিৎসক এবং প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে দেশে প্রচলিত অ্যান্টিভেনমের মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করা সম্ভব। তবে সতর্কতার বিকল্প নেই। তাই এ বিষয়ে দেশের সব অঞ্চলে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও অ্যান্টিভেনম টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

জাদুঘর থেকে যেভাবে ফসলের মাঠে ফিরল বিষধর ‘রাসেলস ভাইপার’  

বিষধর সাপ রাসেলস ভাইপার বাংলাদেশে ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘উলুবোড়া’ নামে বেশ পরিচিত। অনেকেই বলেন, রাসেলস ভাইপার সাপ ভারত থেকে ভেসে বাংলাদেশে এসেছে এবং এটি মাঝখানে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। যার দরুন তাকে রাখা হয়েছিল জাদুঘরে। তবে এ রকম কথার তেমন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশই হচ্ছে এই সাপের আদি বাসস্থান।

এছাড়া দেশের বেসরকারি সংস্থা ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনও বলছে, দেশে রাসেলস ভাইপার থেকেও বিষধর সাপ রয়েছে। সবচেয়ে বিষধর সাপ হিসেবে রাসেলস ভাইপারের নাম প্রচার করা হলেও কেউটে সাপ রাসেলস ভাইপারের চেয়েও বেশি বিষাক্ত।

ইতিহাস থেকে জানা যায়,  রাসেলস ভাইপার (Russell’s viper) (Daboia russelii) বা চন্দ্রবোড়া সাপ আমাদের উপমহাদেশে সর্বপ্রথম শনাক্ত করা হয় ১৭৯৭ সালে। জর্জ শ এবং ফ্রেডরিক পলিডোর নোডার ১৭৯৭ সালে চন্দ্রবোড়া সাপ নথিভুক্ত করেন।

এর আগে ১৭৯৬ সালে বিখ্যাত ‘প্যাট্রিক রাসেল’ তার বইয়ে ভারতীয় সাপদের বিষয়ে পরিচয় দিতে চন্দ্রবোড়া সাপের পরিচয় নথিভুক্ত করেছিলেন। যার জন্য পরবর্তী সময়ে তার নামের সম্মানেই চন্দ্রবোড়া সাপের নামকরণ রাসেলস ভাইপার (Russell’s viper) করা হয়।

পরে ১৯৮২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বিখ্যাত প্রাণিবিদ আলি রেজা খান তার লিখিত ‘ওয়াইল্ড লাইফ অব বাংলাদেশ : এ চেকলিস্ট’ বইয়ে চন্দ্রবোড়া সাপ নথিভুক্ত করেন।

শিকারি চিলের পরিমাণ কমেছে, ফলে বেড়েছে সাপ  

নানা কারণেই দেশে শিকারি পাখি এবং চিলের পরিমাণ অনেক কমে গিয়েছে। যার ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে রাসেলস ভাইপারের সংখ্যা। এমনটিই মনে করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ আহসান।

তিনি বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে সাধারণত আগে একটি বা দুটি ফসল উৎপাদিত হতো। এখন সেই জমিগুলোতে দুটো থেকে তিনটি ফসল উৎপাদিত হয়। ফলে সেখানে ইঁদুরের উপস্থিতি বেড়েছে। আর রাসেলস ভাইপার বা যে কোনো সাপেরই প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। ফলে জমিতে ফসল হলে ইঁদুর হচ্ছে আর ইঁদুর হলে সাপও হচ্ছে। আর বড় কথা হলো রাসেলস ভাইপার ডিম না দিয়ে বাচ্চা দেয়। ফলে এর বংশ বাড়ছে। আবার নদীর স্রোতে কচুরিপানার মাধ্যমে ভারতের লাগোয়া অঞ্চল থেকেও রাসেলস ভাইপার ভেসে এসেছে। রাসেলস ভাইপার মাটিতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও এরা সাঁতার ভালো কাটতে পারে। ফলে এর বাচ্চাগুলোও নদীর পানিতে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে। আবার চিল জাতীয় প্রাণী যারা সাপ খায় তাদের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে একচেটিয়া ভাবে সাপের বৃদ্ধি হচ্ছে।

এই অধ্যাপক আরও বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষকদের গামবোট ও জিন্সের প্যান্ট পরিধান করতে হবে। সতর্কতার বিকল্প নেই। আর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগী বাঁচানো সম্ভব। তবে চরাঞ্চল থেকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেকেই ওঝার কাছে যাচ্ছে। এগুলো না করে দ্রুত সময়ের মধ্যেই রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে।

ঠান্ডা মাথার খুনি রাসেলস ভাইপার  

সাধারণত বিরক্তবোধ না করলে কিংবা আত্মরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে এমনটি মনে না করলে রাসেলস ভাইপার অনেকটা শান্তই থাকে। বিপদ আঁচ করতে পারলে এটি কুণ্ডলী পাকিয়ে অবস্থান নেয়।

 

ঢাকা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাহসিনা জেরিন বলেন, রাসেলস ভাইপার সাপের বৈজ্ঞানিক নাম ডাবোয়া রুসেলি। এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪ ফুট লম্বা হতে পারে। এর দেহের রং সাধারণত বাদামি বা ধূসর, যার উপর হলুদ ও কালো ছোপ থাকে। এই সাপটি প্রধানত রাতে সক্রিয় হয়, তবে দিনেও সক্রিয় হতে পারে। এটি সাধারণত খোলা জায়গায় বাস করে। যেমন, ক্ষেত, ঝোপঝাড় এবং গ্রামীণ এলাকা। তবে রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি হেমোটক্সিনের মতো কাজ করে, যা রক্তের জমাট বাঁধার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। সাপের কামড়ে সাধারণত তীব্র ব্যথা, রক্তপাত, এবং কখনও কখনও মৃত্যুও হতে পারে। যদি সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হয়।

বাংলাদেশের যেসব জায়গায় রাসেলস ভাইপার সাপের বাসস্থান

ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শুভব্রত সরকার ঢাকা পোস্টকে জানান, ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের অন্তত ১৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চল, গড়াই এবং পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলে বেশি অবস্থান ছিল রাসেলস ভাইপারের। এছাড়া সে সময় দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল এবং মানিকগঞ্জে রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিতি দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে এর আওতা আরও বেড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, রংপুর, নওগাঁ, মাদারীপুর, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, দিনাজপুর, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিত দেখা গেছে।

শুভব্রত সরকার বলেন, রাসেলস ভাইপার (চন্দ্রবোড়া) বহিরাগত কোনো সাপ নয়। আদিকাল থেকেই বাংলাদেশে পদ্মাবিধৌত অঞ্চলগুলোর ঘাসবন সমৃদ্ধ চরাঞ্চলে এর উপস্থিতি ছিল। বর্তমান সময়ে অধিক চাষাবাদের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, বনভূমি ও চরের প্রাকৃতিক প্রাণী আবাস নষ্ট করা, গণহারে রাসেলস ভাইপার সাপের প্রাকৃতিক শিকারি প্রাণী যেমন- শিয়াল, বেজি, চিল, বাজ, খাটাশ, বনবিড়াল, পেঁচা হত্যার কারণে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আর বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেই রাসেলস ভাইপার সাপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাসেলস ভাইপার সাপ মেরে ফেলার মাধ্যমেই এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা কোনো সঠিক সমাধান নয়। বাস্তুতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিয়াল, খাটাশ, বেজি, পেঁচাসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাস সংরক্ষণের মাধ্যমেই একমাত্র সঠিক উপায়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

মানবদেহে যেভাবে কাজ করে রাসেলস ভাইপারের বিষ

বিভিন্ন গবেষণাপত্র এবং বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিষধর সাপ রাসেলস ভাইপারের বিষ একটি জটিল মিশ্রণ যা প্রোটিন, এনজাইম এবং অন্যান্য বায়োমলিকিউল নিয়ে গঠিত। এই বিষ অত্যন্ত বিষাক্ত এবং এটি মানুষের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি করতে পারে।

রাসেলস ভাইপার সাপের বিষের উপাদান ‘এনজাইম’ টিস্যুর মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার নিশ্চিত করে। আরেক উপাদান ‘ফসফোলিপেজ’ সেল মেমব্রেন ধ্বংস করে এবং হেমোলাইসিস সৃষ্টি করে, যা রক্ত কোষের ক্ষতি করে। অন্য উপাদান ‘প্রোটিনেজ’ দেহের প্রোটিন ভেঙে ফেলে, যা টিস্যু ধ্বংস এবং রক্ত জমাট বাধার ক্ষমতা হ্রাস করে।

এছাড়াও রাসেলস ভাইপার সাপের বিষে থাকে ‘হেমোটক্সিন’। যা রক্তের জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এটি রক্তজমাট বাঁধার ক্ষমতা নষ্ট করে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তপাত সৃষ্টি করে। বিষে থাকা কিছু উপাদান কিডনিরও ক্ষতি করে। যা দংশনের পর থেকে সময় বাড়ার সাথে সাথে কিডনি ফেলিওরের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ রক্ত জমাট বাঁধার পথকেও ব্যাহত করে। ফলে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমাট বাঁধা কিংবা অতিরিক্ত রক্তপাতের সৃষ্টি করতে পারে। কিছুক্ষেত্রে স্বল্প মাত্রায়  ‘নিউরোটক্সিন’ এর প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির স্নায়বিক সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

এছাড়া মানবদেহে রাসেলস ভাইপার সাপের বিষের প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি সাপে কামড়ানোর জায়গায় তীব্র ব্যথা অনুভব করেন এবং সেই জায়গায় ফোলা দেখা যায়।

যেসব কারণে লোকালয়ে বিস্তৃতি বাড়াচ্ছে রাসেলস ভাইপার  

গত কয়েক বছরে রাসেলস ভাইপার সাপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এবং লোকালয় কেন্দ্রিক হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তার প্রাকৃতিক বাসস্থানের পরিবর্তনকে উল্লেখ করা হচ্ছে। আবার বনাঞ্চল ধ্বংস এবং কৃষি জমির সম্প্রসারণের ফলে সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। ফলে এটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় চলে আসছে।

আবার আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং ঋতু পরিবর্তনের কারণে সাপের আচরণে পরিবর্তন আসছে এবং তারা নতুন এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যের অভাবেও সাপ নতুন শিকার খুঁজতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি চলে আসছে।

ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ সমন্বয়ক সাহাদাত হোসেন বলেন, নাব্যতা সংকটে সৃষ্ট নতুন চর রাসেলস ভাইপার সাপের আদর্শ বাসস্থান। চর অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ হচ্ছে। এতে রাসেলস ভাইপারের পছন্দসই শিকার ইঁদুর কমে যাচ্ছে। ফলে এটি জায়গা পরিবর্তন করছে। আবার ধানক্ষেতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাসেলস ভাইপার পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, এখন প্রয়োজনীয় খাদ্যের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করা হয়। এতে শস্যের প্রাচুর্যতার কারণে ইঁদুরের সংখ্যা সেখানে বেশি থাকে। রাসেলস ভাইপার সাপও ইঁদুরের লোভে ধানক্ষেতে অবস্থান নিচ্ছে।

সাহাদাত বলেন, রাসেলস ভাইপার সাপের মুখোমুখি হয়ে গেলে আপনি দেখার আগেই সাপ আপনাকে সতর্ক করবে। অধিকাংশ সময়ই প্রেশারকুকারের মতো খুব জোরে ‘হিস হিস’ শব্দ করে নিজের অবস্থান জানান দেয়। এমন অবস্থায় নিরাপদ দূরত্ব বজার রেখে সেই স্থান ত্যাগ করলে সংঘাতের কোনো সম্ভাবনা নেই। সাপ মারতে গেলে বা একেবারে সাপের গায়ের কাছে চলে গেলে সাপ প্রতিরক্ষার জন্য কামড় দিতে পারে। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাসেলস ভাইপার কামড় দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে অ্যান্টিভেনম সমৃদ্ধ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। যথা সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত না করতে পারলে অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাই সাপের কামড়ে ওঝার কাছে নয় বরং সঠিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

রাসেলস ভাইপার দংশনে অ্যান্টিভনমে কাজ হয় না— এ তথ্য ভুল

সাম্প্রতিক সময়ে চাউর হয়েছে রাসেলস ভাইপার দংশন করলে অ্যান্টিভেনাম দিলেও রোগী মারা যায়। তবে এ বিষয়টি সত্য নয় বলে জানিয়েছেন টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ।

তিনি বলেন, বলা হয়ে থাকে রাসেলস ভাইপারের দংশনের শিকার বেশিরভাগ রোগীই মারা যান। অ্যান্টিভেনমে কাজ হয় না। এটি ভুল তথ্য। বরং বেশিরভাগ রোগীই সুস্থ হয়ে যান। এই উপমহাদেশে সাপের দংশনের ঐতিহ্যগত চিকিৎসা (ওঝা) প্রচলিত ছিল। আমার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মানুষ সাপে কামড় দেওয়ার পর সর্বপ্রথম যায় ওঝার কাছে। পরে একেবারেই শেষ সময় আমাদের কাছে আসে। অথচ সময় হচ্ছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সময়ে রোগীকে উপজেলা হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে আসা দরকার।

তিনি আরও বলেন, অ্যান্টিভেনাম অনেক পুরনো একটি ওষুধ। যার দ্বারা বিষধর সাপের কামড়ের চিকিৎসা করা হয়। আমরা মূলত, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অ্যান্টিভেনাম ব্যবহার করে থাকি। আমি আবারও বলছি এখানে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে রাসেলস ভাইপারের বিষে অনেকগুলো জটিল উপাদান রয়েছে। দেরি করলেই এখানে সমস্যা তৈরি হয়। যথাযথ চিকিৎসা করলে বেশিরভাগ রোগীকেই বাঁচানো সম্ভব।

ডা. আবুল ফয়েজ আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আমার পাঁচশর বেশি রোগীকে অ্যান্টিভেনাম দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি আশ্বস্ত করতে চাই, এসব অ্যান্টিভেনামের কার্যকারিতা আছে। একই সঙ্গে আমি আরও আশ্বস্ত করতে চাই রাসেলস ভাইপারের চিকিৎসা আমাদের দেশে আছে এবং আমাদের চিকিৎসকরা তা করতে সক্ষম।

রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে  

রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে সচেতনতার চেয়ে আতঙ্ক বেশি ছড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাণিবিদ আবু সাইদ। তিনি বলেন, সাপ নাম শুনলে ভয় পায় না এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অথচ সাপ হচ্ছে একটি নিরীহ প্রাণী। ছোবল দিতে পারে এমন ভয়েই সাপ দেখা মাত্র মানুষ মারতে উদ্যত হয়। পৃথিবীতে ৪ হাজার ৭৩ প্রজাতির সাপ আছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ সাপ বিষধর। বাকি সবই নির্বিষ। আর বাংলাদেশে ২ প্রজাতির গোখরো, ৫ প্রজাতির কেউটে এবং ভাইপার প্রজাতির রাসেলস ভাইপারের কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয়।

এই প্রাণিবিদ আরও বলেন, বাংলাদেশের ২০০২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগের ১২টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের বিস্তৃতি ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৫টি জেলায় এর বিস্তৃতি হয়েছে। সম্প্রতি মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ি এবং চাঁদপুরের রাসেলস ভাইপারের দংশনের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ সার্ভে অনুযায়ী, প্রতিবছর সাড়ে সাত হাজার মানুষ এবং আড়াইহাজার গবাদি পশু সাপের দংশনে মারা যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় কোন প্রচার-প্রচারণা কিংবা উদ্বেগ ছিল না। এখন রাসেলস ভাইপারে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ এবং আতঙ্ক বেশি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বুঝে না বুঝেই অনেক ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, রাসেলস ভাইপারের কোন অ্যান্টিভেনম নেই। অথচ এটি ভুল তথ্য।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2015
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: রায়তাহোস্ট
error: Content is protected !!