ইপেপার / প্রিন্ট
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট—১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ফেরিঘাট টার্মিনাল এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত বাস্তবতার সামনে। সব ধরনের অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও নেই কোনো ফেরি, নেই যাত্রী কিংবা পণ্যবাহী নৌযান। ফলে এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে একটি ব্যর্থ প্রকল্পের প্রতীকে।
এই ঘাটকে কেন্দ্র করে বালাসী–বাহাদুরাবাদ নৌরুট চালুর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়দের কাছে এখন একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি।
ঐতিহাসিকভাবে এই নৌপথের গুরুত্ব ছিল বিশাল। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া তিস্তামুখ ঘাট ছিল উত্তরাঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদপথে ট্রেনসহ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ছিল নিয়মিত। পরে নদীর নাব্যতা সংকট দেখা দিলে ১৯৯০ সালে ঘাটটি বালাসীতে স্থানান্তর করা হয়।
একসময় বালাসী ছিল ব্যস্ত নদীবন্দর। কিন্তু সময়ের সাথে নদীর প্রবাহ পরিবর্তন, নাব্যতা সংকট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে এই রুট বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৭ সালে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ফেরিঘাট নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়, যা পরে সংশোধন হয়ে দাঁড়ায় ১৪৫ কোটি টাকায়। প্রকল্পের আওতায় দুই পাড়ে আধুনিক টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড, টোল প্লাজা, পুলিশ ব্যারাক, ফায়ার সার্ভিস স্টেশনসহ নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।
কিন্তু পরীক্ষামূলক ফেরি চলাচল বারবার ব্যর্থ হয়। পরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA)-এর তদন্তে উঠে আসে গুরুতর ত্রুটি—সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অভাব, নদীর মরফোলজি বিবেচনা না করা, অপর্যাপ্ত ড্রেজিং এবং সমন্বয়হীনতা।
ফলে প্রকল্পটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ঘাট এলাকা প্রায় জনশূন্য। বর্ষাকাল ছাড়া নদীতে তেমন পানি থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে মানুষকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে পার হতে হয়। যেখানে একসময় দিনে শত শত যাত্রী চলাচল করতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫০–২০০ জনে।
স্থানীয় ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, বেকার হয়ে পড়েছেন শত শত মানুষ। সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ড্রেজিংয়ের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তব কোনো উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রুট সচল রাখতে যে পরিমাণ নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন, তা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।
এ অবস্থায় BIWTA বালাসীতে একটি স্থায়ী ড্রেজার বেজ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে রংপুর বিভাগের নদীগুলোতে দ্রুত খনন কাজ পরিচালনা করা হবে। তবে এতে মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, বালাসী–বাহাদুরাবাদ রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এই সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে।
কিছু স্থানীয় বাসিন্দা মনে করছেন, অচল টার্মিনালকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত।
এই মুহূর্তে বালাসীঘাট দাঁড়িয়ে আছে এক দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতায়—একদিকে ব্যর্থ প্রকল্পের দায়, অন্যদিকে সম্ভাবনার নতুন স্বপ্ন। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল অবকাঠামো নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায়।