ইপেপার / প্রিন্ট
ধর্ষণের ভিডিও ভাইরালের প্রতিশোধ: মহাদেবপুরে ২ শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ
১০ মাস পর কবর থেকে তোলা হলো শিশু নাঈমের লাশ; নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র
সিআইডির তদন্তে নতুন মোড়
নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩ বছরের শিশু নাঈম ও ৫ বছরের শিশু আরাফাতের চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার ১০ মাস পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বিনোদপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে নিহত শিশু নাঈমের অবয়ব সিআইডি ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে তোলা হয়।
নিহত ৩ বছর বয়সী শিশু নাঈম ইসলাম উপজেলার বিনোদপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে। সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক। নাঈমের সাথে প্রাণ হারানো তার সার্বক্ষণিক খেলার সাথি ৫ বছরের শিশু আরাফাত ছিল একই গ্রামের আইজুল হকের নাতি।
এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবারের দাবি, এটি কোনো সাধারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু বা সলিল সমাধি নয়; বরং এক পৈশাচিক ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এক কিশোরীকে ধর্ষণের লোমহর্ষক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চরম প্রতিশোধ নিতেই এই নিষ্পাপ দুই শিশুকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বীজ বোনা হয়েছিল গত বছরের ১৬ জুলাই। ওইদিন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশরুমে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে বখাটেরা। সেই পৈশাচিক দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে নিহত নাঈমের বড় ভাই নাহিদ ইসলাম সাগর। পরবর্তীতে ভিডিওটি এলাকায় ভাইরাল হয়ে পড়লে ফেঁসে যায় অভিযুক্ত ধর্ষক ও তাদের পেছনে থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে সাগরের পরিবারকে এলাকাছাড়া করার পাশাপাশি ‘দেখে নেওয়ার’ অনবরত হুমকি দিয়ে আসছিল তারা।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, পূর্ব শত্রুতা ও হুমকির ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সকালে নাঈম তার প্রিয় লাল প্লাস্টিকের হাতপাখা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। সঙ্গী হয় প্রতিবেশী শিশু আরাফাত। অভিযোগ রয়েছে, ঘাতকরা নাঈমকে কৌশলে একটি বাড়ির ভেতরে ডেকে নিয়ে গলা টিপে হত্যা করে। খেলার সাথি ৫ বছরের শিশু আরাফাত বিষয়টি দেখে ফেলায় প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে তাকেও শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়। পরে দুই শিশুর মরদেহ পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।
স্বজনরা জানান, নাঈমের গলায় স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাছাড়া পানিতে ডুবে মারা গেলে পেটে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা, তা পাওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ভেজা প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় তড়িঘড়ি করে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে, যা এই খুনের তত্ত্বকে আরও জোরালো করে।
তবে হত্যাকাণ্ডের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে অভিযুক্ত পক্ষ। তাদের দাবি, শিশু দুটি অসাবধানতাবশত পুকুরের পানিতে পড়ে মারা গেছে। মূলত জমি সংক্রান্ত পুরোনো বিরোধের জেরে তাদেরকে এই ঘটনায় ফাঁসানো হচ্ছে। বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই নিহতদের পরিবার এই হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ভিডিওর গল্প সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে বলে দাবি তাদের।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর স্থানীয় থানায় বারবার ধরণা দিয়েও কোনো সহযোগিতা মেলেনি। প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করায় বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তারা। বর্তমানে আদালতে এ সংক্রান্ত ৯০৪ নম্বর একটি মামলা বিচারাধীন।
মামলাটি প্রথমে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তদন্ত করে। তবে বারবার তারিখ পরিবর্তন হলেও তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় এবং পিবিআই-এর তদন্ত কর্মকর্তা একটি ‘মনগড়া ও একপেশে’ প্রতিবেদন দাখিল করায় আদালতে নারাজি আবেদন দেন মামলার বাদী। এরই প্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি সিআইডিকে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন এবং তদন্তের স্বার্থেই আজ লাশ উত্তোলনের এই প্রক্রিয়া চালানো হয়।
আজ মঙ্গলবার নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মো. রাশেদ, সিআইডি, থানা পুলিশ এবং মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে নাঈমের লাশ উত্তোলনের সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানহারা মা অশ্রুসিক্ত চোখে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, “আমার কলিজার টুকরাদের যারা মেরেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই। আমরা গরিব মানুষ বলে কি আমাদের নাঈমের রক্তের দাম নেই? আমরা কি দেশে বিচার পাব না?”
এর আগে গত ১৪ ও ১৫ মার্চ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে “মহাদেবপুরে দুই শিশুকে হত্যার অভিযোগ, বিচার না পেয়ে দিশেহারা পরিবার” শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চরম ক্ষোভ ও শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। আজ নাঈমের লাশ উত্তোলনের পর পুরো এলাকায় নতুন করে তোলপাড় ও চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামবাসী ও নিহতের স্বজনেরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই জোড়া খুনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মাহবুবুজ্জামান সেতু