ইপেপার / প্রিন্ট
দেশজুড়ে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে মৃত্যুও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কার্যক্রমে ভাটা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত না হওয়ার ভয়াবহ বাস্তব চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা এবং জনস্বাস্থ্য ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, বর্তমানে সারা বিশ্বেই হাম বেড়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত শিশু মৃত্যুর ঘটনা অন্য কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এমনকি আফ্রিকার বহু দরিদ্র দেশেও পরিস্থিতি এত ভয়াবহ নয়। তার মতে, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের অভাবই এত শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র টিকাদান কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও দেশে দ্রুত জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। আক্রান্ত অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে কঠোর আইসোলেশন ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও ছিল বড় ধরনের ঘাটতি। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। ফলে হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যেসব শিশুর শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের জন্য হাম অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফন নেসা জানান, হাম শিশুদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ রোগ প্রতিরোধ সেল ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে শিশুর শরীর অন্যান্য সংক্রমণের প্রতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। হাম ও নিউমোনিয়া একসঙ্গে হলে শিশুর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এমন অবস্থায় অনেক সময় হাসপাতালের অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েও রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। একইসঙ্গে দেশে ব্রেস্টফিডিংয়ের হার কমে যাওয়ায় শিশুরা মায়ের বুকের দুধ থেকে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও ঠিকমতো পাচ্ছে না। ফলে হামের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এদিকে জাতীয় ইপিআই সার্ভেইল্যান্সের তথ্য বলছে, আক্রান্ত শিশুদের ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ তারা এখনও টিকা নেওয়ার বয়সেই পৌঁছায়নি। এই তথ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ এত কম বয়সী শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হামে আক্রান্তদের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এক ডোজ এবং ১১ দশমিক ৭ শতাংশ দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছিল। ফলে টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে টিকার কার্যকারিতা, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা শতভাগ সংক্রমণ ঠেকাতে না পারলেও এটি মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনে। টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়া শিশুদের বেশিরভাগই তুলনামূলক কম জটিলতায় ভুগে সুস্থ হয়ে ওঠে। তাই টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
২০২৫ সালে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ভাটা পড়ে বলে জানিয়েছে ইপিআই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, আন্দোলন এবং অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে টিকা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক এলাকায় টিকা সরবরাহ বন্ধ ছিল, আবার কোথাও টিকাকেন্দ্রে টিকা পৌঁছায়নি। ফলে হাজার হাজার শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ১০ মাস ধরে পোর্টারদের বেতন বন্ধ থাকায় অনেকে টিকা পরিবহনের কাজ বন্ধ করে দেন। এতে টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকাবিরোধী প্রচারণা এবং কোভিড-পরবর্তী টিকাভীতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম বলেন, কেন এত শিশু মারা যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। অনেক পরিবার হাসপাতালে আসতে দেরি করছে, যার কারণে জটিলতা আরও বাড়ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিলেই চলবে না; তৃণমূল পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল এবং সিটি কর্পোরেশনের সেকেন্ডারি কেয়ার হাসপাতালগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি নিশ্চিত করতে পারলে মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব।
এছাড়া হাম থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও শিশুদের ঝুঁকি শেষ হচ্ছে না। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক শিশু দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ভুগছে। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে চোখের সমস্যা, কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, এমনকি অন্ধত্বের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি মস্তিষ্কে প্রভাব পড়ে খিঁচুনি, স্নায়বিক জটিলতা ও শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
শিশুদের একটি বড় অংশ মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে, যা তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শারীরিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে একটি পুরো প্রজন্ম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, হাসপাতালে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো, অপুষ্টি মোকাবিলা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অন্যথায় আগামী কয়েক মাসে হাম পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।