পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগণার সোনারপুরে নিহত এক দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের রোষের মুখে পড়েন তিনি। এ সময় তার দিকে ডিম ও কাদা নিক্ষেপ করা হয়, জামা ছিঁড়ে যায় এবং ‘চোর চোর’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। মূল সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে অবস্থিত বাড়িটিতে মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় তাকে কালো পতাকা প্রদর্শন করা হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অভিষেককে ঘিরে থাকা নিরাপত্তা বলয় ভেঙে অনেকেই তার কাছে পৌঁছে যান। এ সময় তার দিকে ডিম ও কাদা ছুড়ে মারা হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে একজন সমর্থক তাকে একটি নীল রঙের হেলমেট পরিয়ে দেন। তবে হেলমেট পরার পরও বিক্ষোভকারীদের একাংশ তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়।
ঘটনার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, তাকে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণের মুখে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, তার চশমা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, জামা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং হেলমেট না থাকলে আরও বড় ক্ষতি হতে পারত।
তিনি আরও দাবি করেন, এলাকায় বহিরাগতদের উপস্থিতির বিষয়ে আগেই পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল, কিন্তু যথাসময়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিহত কর্মীর পরিবারের বাড়িতে অবস্থানকালে তিনি বলেন, “ওরা আমাকে মারতে চায়, মেরে দিক। কিন্তু আমি নিহত কর্মীর বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যাব না।”
এ সময় বাড়ির বাইরে উপস্থিত বিক্ষোভকারীদের কেউ তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেউ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আবার কেউ বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার বিচার দাবি করেন। ফলে ঘটনাস্থলে দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে।
পরবর্তীতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিরাপত্তার মধ্যে সেখান থেকে সরিয়ে নেন। পরে তিনি অসুস্থ বোধ করায় কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার খোঁজ নিতে যান তৃণমূল নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের শীর্ষ নেতারা।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংস আচরণ গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে বিজেপি এই ঘটনার সঙ্গে দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, এটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, এর সঙ্গে বিজেপির কোনো সম্পর্ক নেই। একই সুরে কেন্দ্রীয় নেতা সুকান্ত মজুমদারও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়।
এ ঘটনায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় ঘটনাটিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন এবং যথাযথ তদন্তের দাবি জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ের অসন্তোষ ও উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।