ইপেপার / প্রিন্ট
বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহীরুহের পতন ঘটেছে। তবে এই চলে যাওয়া কেবল এক বিদায় নয়, বরং এটি রেখে গেছে এক গভীর রাজনৈতিক দর্শন। ক্ষমতা, কারাবাস, নিপীড়ন আর দীর্ঘ অসুস্থতার অধ্যায় পেরিয়ে বেগম খালেদা জিয়া যখন বিদায় নিলেন, তখন তার ঝুলি ভর্তি ছিল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সম্মান। তার শেষ বার্তাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট— ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, বরং অহিংসা আর সংযম।
বাংলাদেশের বৈরী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণত প্রতিশোধ এবং প্রতিহিংসার আধিপত্য দেখা যায়। সেখানে বেগম খালেদা জিয়ার ‘সংযমের উচ্চারণ’ এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জীবনের কঠিনতম সময়েও তিনি যেভাবে নিজেকে ধরে রেখেছিলেন, তা তাকে সর্বজনের শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছে। এটি এদেশের রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
বেগম জিয়ার জানাজায় মানুষের যে বাঁধভাঙা জোয়ার দেখা গেছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতুহল তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ড. এস এম এ ফায়েজ এর মতে:
“যারা ইতিহাসের এই বৃহত্তম জানাজায় এসেছেন, তারা শুধু যে বিএনপির আদর্শ ধারণ করেন তা নয়। বেশিরভাগই এসেছেন দেশনেত্রীর প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধার কারণে।”
অন্যদিকে, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ একে দেখছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। তিনি মনে করেন, এই জনসমুদ্রকে কেবল দলীয় শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা ভুল হবে। তার মতে:
এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, এটি ছিল একটি ‘শ্রদ্ধার গণভোট’।
এক সপ্তাহ আগেও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা হয়তো কল্পনা করতে পারেননি যে, শেকড়ের মানুষের মনে তাদের নেতৃত্বের প্রতি এত ভালোবাসা সঞ্চিত রয়েছে।
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এমন সোনালী মুহূর্ত ইতিহাসে খুব কমই আসে।
খালেদা জিয়ার প্রস্থানের পর বিএনপি এখন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে। দলের হাল এখন তারেক রহমানের হাতে। সামনে নির্বাচন, তার ওপর যুক্ত হয়েছে প্রায় চার কোটি নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা।
ড. এস এম এ ফায়েজ মনে করেন, তারেক রহমানের ওপর যে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে তার বাবা-মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। তবে এই আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা এবং জনবান্ধব রাজনীতিতে রূপান্তর করাই হবে বিএনপির জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের মানুষ বছরের পর বছর ধরে প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখে ক্লান্ত। আলতাফ পারভেজ উল্লেখ করেন, বেগম জিয়া কখনও প্রতিপক্ষকে ঘৃণা বা বিদ্বেষের ভাষায় আক্রমণ করেননি। এমনকি তারেক রহমানও এখন পর্যন্ত পরিবারের ওপর হওয়া জুলুমের জন্য সরাসরি কাউকে আক্রমণাত্মক ভাষায় দোষারোপ করেননি। এই যে সংযম, এটিই সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগাচ্ছে।
“বাংলাদেশের মানুষ আর প্রতিশোধের চক্রে যেতে চায় না। তারা চায় একটি সুন্দর, সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ।”
বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় মানে কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থান নয়, এটি বিএনপির একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক ছায়ার অবসান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপি যদি এই ‘সোনালী মুহূর্ত’কে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়ার অহিংস আদর্শকে ধারণ করে এগোতে পারে, তবেই তারা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে সফল হতে পারবে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য এখন সময় হয়েছে আবেগকে শক্তিতে রূপান্তর করে জনবান্ধব হওয়ার।