ইপেপার / প্রিন্ট
ভোলা জেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে বিবি সাওদা (৩৭) নামে জামায়াতে ইসলামীর এক নারী কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট (গোয়েন্দা শাখা)। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (৫ এপ্রিল) রাতে ভোলা সদর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের আদর্শ একাডেমি রোডের ‘ক্ষণিকালয়’ নামের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর সোমবার (৬ এপ্রিল) তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে, গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা শাখা। সোমবার সন্ধ্যায় শহরের ওয়েস্টার্নপাড়ায় দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতারা এ ঘটনার নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে বিবি সাওদার মুক্তি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভোলা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি কাজী মাওলানা হারুনুর রশিদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নাগরিকদের মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত। তিনি দাবি করেন, অতীতে সাইবার আইনের অপব্যবহার করে মানুষের বাকস্বাধীনতা দমন করা হয়েছে এবং বর্তমান সময়েও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও ভোলার এই ঘটনা সেই প্রত্যাশার পরিপন্থি।” একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত সাওদাকে মুক্তি না দেওয়া হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পরিবারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। জানা যায়, বিবি সাওদার তিন বছর বয়সী একটি প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, যার দেখভালের জন্য মায়ের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের দাবি, এই বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলেও তা গুরুত্ব পায়নি।
পুলিশ জানায়, বিবি সাওদা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি ‘Sawoda Sumi’ থেকে রাষ্ট্র এবং সরকারের সমালোচনা করে একাধিক পোস্ট করেছেন। তার একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “আমরা তো চাইলে ইরান থেকে তেল আনতে পারি, তারা তো অনুমতি দিয়েছে। তাহলে দুই-তিন গুণ বেশি দামে কেন ভারত থেকে তেল কিনতে হবে?”—এই ধরনের বক্তব্যসহ আরও কয়েকটি পোস্টকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্র, সরকার এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করেছেন, যা সাইবার সুরক্ষা নেট অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে।
পুলিশ আরও জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে বিবি সাওদা তার ফেসবুক পোস্টগুলোর সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং জানান, মূলত ভিউ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি সমসাময়িক রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে পোস্ট করতেন।
তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে এবং তাতে থাকা তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব না হওয়ায় তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একদিকে সরকারপন্থীরা এটিকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বলে দাবি করছেন, অন্যদিকে বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীরা একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন দেখার অপেক্ষা।