ইপেপার / প্রিন্ট
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) গত দুই বছর যেন এক অনবরত অস্থিরতার গল্প। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, অভিযোগ আর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থাটি যেন এক রোলার কোস্টার যাত্রার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেট মাঠের বাইরের এই অস্থিরতা এখন ছাপিয়ে গেছে মাঠের পারফরম্যান্সকেও।
২০২৪ সালের ৯ আগস্টের একটি দিন যেন এই নাটকের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেদিন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সঙ্গে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল-কে নিয়ে বিসিবি পরিদর্শনে আসেন। তখন কেউ ভাবতেও পারেনি, মাত্র ১৯ মাসের ব্যবধানে সেই তামিমই বসবেন বোর্ড সভাপতির চেয়ারে, আর আসিফ মাহমুদ জড়িয়ে পড়বেন নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে।
এর কিছুদিন পরই বড় পরিবর্তন। ২১ আগস্ট দায়িত্ব ছাড়েন দীর্ঘদিনের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। তার বিদায়ের দিনই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোটায় পরিচালক হিসেবে যুক্ত হয়ে দ্রুতই বোর্ড সভাপতির দায়িত্ব পান ফারুক আহমেদ। কিন্তু তার সময়কালও স্থায়ী হয়নি বেশি দিন। নানা অভিযোগ আর বিতর্কের জেরে মাত্র দশ মাসের মাথায় তার মনোনয়ন বাতিল করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
এরপর দায়িত্বে আসেন বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম বুলবুল। প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তবে সেই নির্বাচন নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। অনিয়মের অভিযোগ তোলেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন তামিম ইকবাল।
কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সরকার পরিবর্তনের পর একে একে পদত্যাগ করতে থাকেন বোর্ডের পরিচালকরা। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়েন ইশতিয়াক সাদেক, এরপর তদন্তের প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করেন আমজাদ হোসেন।
২০২৬ সালের মার্চে সরকার গঠন করে একটি তদন্ত কমিটি, যার লক্ষ্য ছিল বিসিবি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করা। ৫ এপ্রিল সেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে এবং ৭ এপ্রিল তা প্রকাশ করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। প্রতিবেদনে উঠে আসে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ।
এরপরই আসে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত—ভেঙে দেওয়া হয় আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত কমিটি। একই দিনে নতুন করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়, যার সভাপতি করা হয় তামিম ইকবালকে।
সব মিলিয়ে, দুই বছরেরও কম সময়ে বিসিবিতে চারজন সভাপতির পালাবদল—যা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই অস্থিরতা শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকেই নাড়িয়ে দেয়নি, বরং প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
এখন সবার দৃষ্টি নতুন সভাপতি তামিম ইকবালের দিকে। তিনি কি পারবেন এই অস্থিরতা কাটিয়ে বিসিবিকে একটি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ পথে ফিরিয়ে আনতে? নাকি এই অস্থিরতার গল্পে যোগ হবে আরও নতুন অধ্যায়—সেই উত্তরই দেবে সময়।