ইপেপার / প্রিন্ট
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ‘গৃহায়ন ধানমন্ডি প্রকল্পে’ বিশেষ কোটায় অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূতভাবে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক দুই কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন ৮ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. আল আমিন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন।
মামলার এজাহারে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন—দুদকের সাবেক কমিশনার মো. জহুরুল হক, সাবেক সিনিয়র সচিব ও দুদকের সাবেক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শাহজাহান আলী, সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) ড. মো. মইনুল হক আনছারী, সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) বিজয় কুমার মণ্ডল, প্রকল্প পরিচালক (প্রকৌশল ও সমন্বয়) কাজী ওয়াসিফ আহমাদ এবং সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল (সিনিয়র জেলা জজ) সৈয়দ আমিনুল ইসলাম।
দুদক জানায়, আসামিরা পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে দায়িত্বে থেকেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরস্পর যোগসাজশে রাষ্ট্রীয় মূল্যবান সম্পদ বৈষম্যমূলকভাবে বরাদ্দ দিয়েছেন। এজাহারে বলা হয়েছে, দুদকের সাবেক দুই কমিশনার অনৈতিক, বৈষম্যমূলক ও বিধিবহির্ভূতভাবে অন্যান্য ফ্ল্যাটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়ার অনুমোদন দেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা অবস্থায় প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা হলফনামা প্রদান করেন এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ওই সম্পদ অর্জন করেন।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার বাড়ি নং–৭১১ (নতুন ৬৩), সড়ক নং–১৩ (নতুন ৬/এ) শীর্ষক গৃহায়ন ধানমন্ডি (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২২২তম ও ২২৫তম বোর্ড সভায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে অন্যান্য ফ্ল্যাটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের চারটি ফ্ল্যাট একত্রিত করে দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়।
এজাহারে বলা হয়, ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট দুটির আয়তন যথাক্রমে ৪ হাজার ১০৫ দশমিক ০৫ বর্গফুট এবং ৪ হাজার ৩০৮ দশমিক ৬৮ বর্গফুট। একইসঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে স্থাপত্য নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘দিনের ভোট রাতে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত’ থাকা সচিব পদমর্যাদার ১২ জন কর্মকর্তাকে পুরস্কারস্বরূপ এসব ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি আলোচনায় আসে। গত ৫ মে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর দুদক অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
এরপর গত ১২ মে অভিযান চালিয়ে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় দুদক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ধানমন্ডি-৬ এলাকার ৬৩ নম্বর প্লটটি মূলত সরকারি খাস জমি, যার বাজারমূল্য অত্যন্ত বেশি।
দুদকের তথ্যমতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে জমিটি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সেখানে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনটিতে দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট ও নিচতলাসহ দুই তলা গাড়ি পার্কিং রয়েছে। এর মধ্যে ডুপ্লেক্স দুটি বরাদ্দ পান দুদকের সাবেক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান ও মো. জহুরুল হক। বাকি ১০টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয় অন্যান্য সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নামে।
বর্তমানে কমিশনের দুই সদস্যের একটি টিম অভিযোগটি অনুসন্ধান করছে। সহকারী পরিচালক মো. আল আমিনের নেতৃত্বাধীন অনুসন্ধান টিমের অপর সদস্য হলেন উপ-সহকারী পরিচালক নাহিদ ইসলাম।