ইপেপার / প্রিন্ট
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নারী নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা। তাদের মতে, বিপ্লব ও আন্দোলনের অগ্রভাগে নারীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও বাস্তবতায় তারা এখনো নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও বঞ্চনার মধ্যে রয়েছেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নারী নেতৃত্ব, লৈঙ্গিক সমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক সংলাপে এসব মতামত উঠে আসে।
সংলাপে বক্তারা বলেন, সংবিধানে নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সেই অধিকার কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেই নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত, যার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্র পরিচালনায়।
বাংলাদেশ নারী নেতৃত্ব জোটের সভাপতি নাসিম ফেরদৌস বলেন, নারীদের নেতৃত্বে না থাকার অজুহাত হিসেবে ‘যোগ্যতার অভাব’ দেখানো হয়, অথচ বাস্তবে যোগ্য নারীদের পথ পরিকল্পিতভাবে রুদ্ধ করা হয়। সংবিধানে অধিকার থাকলেও তা প্রয়োগে অনীহা স্পষ্ট।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, নারীদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানে পরিবর্তন এলেও নেতৃত্বে বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা এখনো দেওয়া হয়নি। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন এখনো দুর্বল। রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক না হলে বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। তিনি নারী কমিশনকে কার্যকর করা এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও হয়রানি বাড়ছে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেও চরিত্রহননের চেষ্টা চলছে। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
বাংলাদেশ নারী উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, নারীদের প্রতিবন্ধকতা শুরু হয় পরিবার থেকেই। অর্থায়নের অভাব, ব্যাংক ঋণ জটিলতা ও তথ্য সংকট নারীদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথে বড় বাধা। তিনি সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব, স্বল্প সুদে ঋণ এবং ‘জাতীয় নারী নেতৃত্ব একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, নীতিগত ব্যর্থতার কারণে গত তিন দশকে নারীরা আরও বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। জুলাই বিপ্লবে নারীরা সামনে থাকলেও তার সুফল তারা পাননি।
গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের নেতৃত্বে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। নারী-পুরুষ বিভাজনের বাইরে গিয়ে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রান্স ফেমিনিস্ট অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম বলেন, বিপ্লবের পর তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা।
রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি লামিয়া ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনে নারীদের অবদান থাকলেও বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমেই নারীর অধিকার সুরক্ষা সম্ভব।
বক্তারা একমত পোষণ করে বলেন, নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত সংস্কার এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। অন্যথায় বিপ্লবে অংশগ্রহণের স্বীকৃতি শুধু ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তব জীবনে নয়।