ইপেপার / প্রিন্ট
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘিরে নানা সংস্কারের দাবি ওঠে। এরই অংশ হিসেবে পরিবর্তন আনা হয় বাংলাদেশ পুলিশ–এর পোশাকে। তবে শুরু থেকেই নতুন এই পোশাকের রঙ ও নকশা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা দেখা দেয়, যা সময়ের সাথে আরও তীব্র হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন পোশাক গ্রহণ করলেও মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সন্তুষ্টি দেখা যায়নি। বরং ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকেই পোশাকের মান নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। সদস্যদের অভিযোগ, নতুন পোশাক ঘাম শোষণ করতে পারে না, দেশের আবহাওয়ার সাথে এটি উপযোগী নয় এবং দীর্ঘ সময় পরিধানে অস্বস্তিকর।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন–এর সাধারণ সম্পাদক মো. আনিসুজ্জামান জানান, এই পোশাক বাহিনীর মর্যাদা ও পরিচয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পোশাকের সাথে এটি অনেকটাই মিল থাকায় আলাদা করে চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে শুরু থেকেই তারা এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছিলেন।
পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নোমান গ্রুপ–এর তৈরি কাপড়ের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাই করতে কাপড়ের নমুনা ল্যাব টেস্টে পাঠায় পুলিশ সদর দফতর। প্রাপ্ত রিপোর্টে দেখা যায়, চুক্তি অনুযায়ী কাপড়ে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ও সুতার ঘনত্ব বজায় রাখা হয়নি।
পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা নিশ্চিত করেছে, পোশাক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাজেটের প্রয়োজন হবে না।
এ বিষয়ে পুলিশ মিডিয়া শাখার এআইজি শাহাদাত হোসাইন বলেন, যদি পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে মূলত রঙের পরিবর্তন করা হবে। এতে নতুন করে কোনো অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের দরকার হবে না।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, খুব শিগগিরই পুলিশ বাহিনী পুরনো কোনো পরিচিত পোশাকে ফিরে যেতে পারে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য পুরনো পোশাকে ফিরে যেতে আগ্রহী—এমন মতামত ইতোমধ্যেই সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, শুধুমাত্র পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাহিনীর ইমেজ বা মনোবল উন্নত হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
ড. তৌহিদুল হক, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলেন, পুলিশের পোশাক ও রঙের সাথে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার একটি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেবল বাহ্যিক নয়, কার্যকারিতা ও জনমনের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক নিয়ে বিতর্কে আটকে না থেকে সরকারের উচিত পুলিশের কর্মদক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং অনিয়মের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।
সবশেষে তারা জোর দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে যেন পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো না হয়—সেই বিষয়টি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।