ইপেপার / প্রিন্ট
ফরিদপুরে পদ্মায় জেলের বড়শিতে ধরা পড়ল বিরল প্রজাতির মিঠা পানির কুমির
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় পদ্মা নদীতে এক বিরল প্রজাতির মিঠা পানির কুমির ধরা পড়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় এক জেলের হাজারি বড়শিতে আটকে পড়া কুমিরটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কুমিরটিকে নিরাপদে রাখা হয়েছে এবং বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দলের অপেক্ষা চলছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার গোপালপুর চর এলাকায় পদ্মা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে এই বিরল দৃশ্যের সম্মুখীন হন জেলে স্বপন বেপারী (৪৮)। প্রতিদিনের মতো আগের রাতে তিনি ‘হাজারি বড়শি’ পদ্ধতিতে নদীতে বড়শি পেতে রাখেন। এই পদ্ধতিতে একটি দীর্ঘ ও শক্ত দড়ির সঙ্গে একাধিক বড়শি যুক্ত করে নদীতে ফেলা হয়, যা বড় আকারের মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত হয়।
সকালে বড়শি তুলতে গিয়ে স্বপন বেপারী লক্ষ্য করেন, একটি বড় আকৃতির কুমির অসংখ্য বড়শি ও সুতোয় জড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত তার দুই ছেলে রাজিব বেপারী (১৬) ও রবিউল বেপারী (২৯) সহ আশেপাশের আরও কয়েকজনের সহায়তা নেন। প্রায় পাঁচজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কুমিরটিকে কোনো ধরনের আঘাত ছাড়াই নদী থেকে তীরে তোলা হয়।
উদ্ধারকারীদের সবাই চর সালেপুর এলাকার বাসিন্দা। পরে সকাল ৮টার দিকে কুমিরটিকে চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়নের কাজী বাড়ির ঘাটে নিয়ে আসা হয়। সেখানে কুমিরটিকে পানির মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে বেঁধে রাখা হয়েছে, যাতে এটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে পারে এবং কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।
জেলে স্বপন বেপারী জানান, “আমি প্রতিদিনের মতো বড় মাছ ধরার আশায় বড়শি পেতেছিলাম। সকালে গিয়ে দেখি, একটি বড় কুমির তাতে আটকে আছে। আমরা সেটিকে না মেরে সাবধানে উদ্ধার করি। এখন বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষা করছি।”
স্থানীয়দের মতে, পদ্মা নদীতে এ ধরনের কুমির খুব একটা দেখা যায় না, ফলে ঘটনাটি এলাকায় কৌতূহল ও উদ্বেগ দুই-ই সৃষ্টি করেছে। অনেকেই কুমিরটিকে দেখতে ভিড় করছেন, তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন জানান, “কুমিরটি বর্তমানে কাজী বাড়ির ঘাট এলাকায় পানির মধ্যে নিরাপদে রাখা হয়েছে। কেউ যাতে কুমিরটির ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছে। বন বিভাগের দল আসার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, ফরিদপুর বন বিভাগের ফরেস্ট রেঞ্জার তাওহীদ হোসেন জানান, এটি একটি বিপন্ন প্রজাতির মিঠা পানির কুমির হতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি এটি একটি বিরল প্রজাতির কুমির। খুলনা থেকে আমাদের বিশেষজ্ঞ দল আসার পর এর সঠিক প্রজাতি, দৈর্ঘ্য ও ওজন নির্ধারণ করা হবে।”
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কুমিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাত ফুট এবং ওজন আনুমানিক দেড় মণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কুমির নদীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এগুলোর সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
এ ঘটনার মাধ্যমে স্থানীয়দের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলে স্বপন বেপারীর মতো সাধারণ মানুষের এই মানবিক উদ্যোগ প্রশংসনীয়, যা প্রমাণ করে সচেতনতা থাকলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান সম্ভব।