ইপেপার / প্রিন্ট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থী। তাদের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী ঋণগ্রহীতা এবং আয় ও আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জানিয়েছে, অনেক প্রার্থী প্রয়োজনীয় আয়কর বিবরণী দাখিল না করায় তাদের মনোনয়নকে অসম্পূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সুজন। সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের আর্থিক তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদসহ অন্যান্য নেতারা।
সুজনের তথ্যমতে, মোট প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৩১৯ জন আয়কর প্রদানের তথ্য জমা দিয়েছেন। তবে ১৩২ জন প্রার্থী কেবল টিআইএন সনদ জমা দিয়েছেন, আয়কর বিবরণী দাখিল করেননি। এছাড়া বেশ কয়েকজন প্রার্থী হলফনামায় আয়ের তথ্য উল্লেখ না করায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঋণগ্রহীতা প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন ঋণগ্রহীতা, যা মোট প্রার্থীর ২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে ৭৫ জন প্রার্থী পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন। দলভিত্তিক হিসাবে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির ১৬৭ জন প্রার্থী ঋণগ্রহীতা, যা মোট ঋণগ্রহীতার ৩২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
তবে আগের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর হার কিছুটা কমেছে বলে জানায় সুজন। আগের নির্বাচনে এই হার ছিল ২২ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা এবারে কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশে।
প্রার্থীদের আয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট প্রার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশের বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকার নিচে। সংখ্যায় যা ৮৩২ জন। অন্যদিকে, এক কোটি টাকার বেশি আয় রয়েছে এমন প্রার্থীর সংখ্যা ৯৫ জন। ৭৪১ জন প্রার্থীর আয় পাঁচ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে, ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় করেন ১৩২ জন এবং ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মধ্যে আয় করেন ৭১ জন প্রার্থী। এছাড়া ১৫৫ জন প্রার্থী হলফনামায় আয়ের কোনো তথ্য উল্লেখ করেননি।
আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। আয়কর প্রদানকারী ১ হাজার ৩১৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৭৯ জন, অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ৩২ শতাংশ প্রার্থী পাঁচ হাজার টাকা বা এর কম আয়কর দিয়েছেন। এক লাখ টাকার বেশি আয়কর দিয়েছেন ৩৫৮ জন এবং ১০ লাখ টাকার বেশি কর দিয়েছেন ১১৬ জন প্রার্থী।
সুজন জানায়, আয়কর প্রদানের হার আগের নির্বাচনের তুলনায় বেড়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেখানে ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রার্থী আয়কর দিয়েছিলেন, সেখানে এবারের নির্বাচনে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ১০ শতাংশে।
কোটি টাকার বেশি আয় করা প্রার্থীদের তালিকায় বিএনপির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ তালিকায় বিএনপির ৫১ জন প্রার্থী রয়েছেন। এরপর রয়েছেন ২৫ জন স্বতন্ত্র ও ৫ জন জাতীয় পার্টির প্রার্থী।
শীর্ষ আয়কারীদের মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছেন কুমিল্লা–৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকারিয়া তাহের, যার বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন টাঙ্গাইল–১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম, যার আয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে আছেন লক্ষ্মীপুর–১ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারী, যার আয় প্রায় ১৯ কোটি টাকা।
সুজনের মতে, প্রার্থীদের আয়, ঋণ ও আয়কর সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন নিয়ে জনআস্থার সংকট তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।