বরগুনায় আবারও ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল জেলাটিতে। সরকারি হিসাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। স্বাস্থ্য বিভাগ বরগুনাকে ‘ডেঙ্গু হটস্পট’ হিসেবে ঘোষণা করলেও চলতি বছর ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়।
বিশেষ করে বরগুনা পৌর শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো মশক নিধন, ড্রেন পরিষ্কার কিংবা জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। গত বছরের ভয়াবহ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসক, সচেতন নাগরিক ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা।
সরেজমিনে বরগুনা সদর উপজেলার ২ নম্বর গৌরীচন্না ইউনিয়নের দক্ষিণ মনসাতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এলাকার একমাত্র ড্রেনটিও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে মশার প্রজননের আদর্শ পরিবেশ।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বলেন, “আমাদের এলাকায় প্রতিদিন মানুষ বাড়ছে, কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাড়েনি। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। এতে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার নেয়।”
আরেক বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “গত বছর প্রায় প্রতিটি ঘরেই ডেঙ্গু রোগী ছিল। অথচ এ বছর এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আবারও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।”
শুধু দক্ষিণ মনসাতলী নয়, বরগুনা পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভা ও প্রশাসনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম খুবই সীমিত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা কেবল প্রশাসনিক এলাকা বা কর্মকর্তাদের বাসভবনের আশপাশেই সীমাবদ্ধ।
পৌর শহরের বাসিন্দা মোর্শেদ সুজন বলেন, “গত বছর ৫০ জনের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। কিন্তু এখনো কোনো বড় ধরনের প্রস্তুতি নেই। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।”
আমিনুল ইসলাম নাবিল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা দায় হয়ে গেছে। মশার উপদ্রব ভয়াবহ। নাগরিক সেবার মানও আগের তুলনায় কমে গেছে।”
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর মার্চের পর থেকেই বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ২৫০ শয্যার বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ জন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে স্বাস্থ্য বিভাগ বরগুনাকে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ ঘোষণা করে। জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরে ডেঙ্গুর কারণ অনুসন্ধানে আইইডিসিআরের ছয় সদস্যের একটি তদন্ত দল বরগুনা পরিদর্শন করে। তদন্তে তারা জানান, খোলা পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার অভাব ডেঙ্গু বিস্তারের প্রধান কারণ।
বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে মারা যান ১৫ জন। তবে জেলার বাইরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় ৯১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবুও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি মনির হোসেন কামাল বলেন, “বৃষ্টি বাড়লেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু ওষুধ ছিটালেই হবে না, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং জলাবদ্ধতা দূর করাও জরুরি।”
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, “গত বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের এখনো নাড়া দেয়। এবার আগে থেকেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করা, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো জরুরি।”
তবে স্থানীয় প্রশাসন দাবি করছে, তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রস্তুতি শুরু করেছে। বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পৌর প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, “প্রতিটি ইউনিয়নে ফগার মেশিন দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।”
অন্যদিকে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানিয়েছেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হাসপাতালগুলো আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে ল্যাব সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো দৃশ্যমান কার্যক্রম খুবই সীমিত। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আবারও ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে বরগুনা।