ইপেপার / প্রিন্ট
সাধারণ মানুষ এখনো জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকায় চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে—এমন পরিস্থিতিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে যত নীতিই নেওয়া হোক না কেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে পাবলিক ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্ক (পাইনেট) আয়োজিত ‘দ্রব্যমূল্য ও ভোটার ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন আলোচকরা।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মামুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশাররফ হোসেন। পাইনেটের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান সভা সঞ্চালনা করেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিগত প্রায় ১৭ বছর ধরে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। ফলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে তারা সাহস পাচ্ছে না। একজন শাসকের কাছে মানুষের প্রত্যাশা—যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে জীবনের ঝুঁকি থাকবে না।
বক্তারা আরও বলেন, কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। ভোটারদের আস্থা ফেরানো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা না বাড়ালে গণতন্ত্র দুর্বলই থেকে যাবে। ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার প্রবণতাকে তারা একটি বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, “বাংলাদেশে ভোক্তা মানেই ভুক্তভোগী। শ্রমিক কাজ করেও দরিদ্র থাকে—এটা আমাদের নীতিগত ব্যর্থতা।” তিনি বলেন, জরুরি নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি হলেও বিলাসপণ্যে তা কম থাকে, যার ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, এমপি এখন আর শুধু ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট’ নন, বরং ‘ম্যাজিক্যাল পাওয়ারের’ অধিকারী হয়ে গেছেন। এমপিদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী এমপি হলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে স্বার্থসংঘাত তৈরি হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নির্বাহী সদস্য মোহা. শওকত আলী খান বলেন, বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। “সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে দ্রব্যমূল্য কমানো অসম্ভব,” বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবায়ের আহমেদ বলেন, সাধারণ মানুষ সরকারকে দায়ী করলেও সরকার কী করতে পারত বা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে—তা অনেকেই জানে না। তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের স্বচ্ছতাও অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট পরিকল্পনা রাখার দাবি জানান তিনি।
অপরাজিতা বিডির সম্পাদিকা আকলিমা ফেরদৌসী বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আয়-ব্যয়ের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিয়েই দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করতে হবে। বাসাভাড়া থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) সালেহা আফরোজ বলেন, আমদানি নির্ভরতার কারণে অতীতে সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কৃষি উৎপাদনে জোর দেওয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে পেঁয়াজ উৎপাদনে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. শাব্বির আহমেদ বলেন, “বেতন বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না।” তিনি দাবি করেন, মানুষের আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পরোক্ষভাবে চাঁদায় চলে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ভুঁইয়া বলেন, হকারদের উচ্ছেদ নয়, বরং চাঁদাবাজিমুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আনলে সাধারণ মানুষ কম দামে পণ্য পাবে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশেও ফুটপাতে ব্যবসা রয়েছে, কিন্তু সেখানে চাঁদাবাজি নেই।
বৈঠকের আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।