ইপেপার / প্রিন্ট
দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এ পরীক্ষায় নকল, ডিজিটাল জালিয়াতি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ১৮ মাসে অনুষ্ঠিত ১৮টি পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে রেকর্ডসংখ্যক ২ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার ও শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নেতিবাচক একটি বার্তা বহন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও শৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শাস্তির ঘটনা ঘটেছে অনার্স পর্যায়ে। অনার্স ৩য় বর্ষ-২০২৩ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৩৩৭ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন। এছাড়া অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২৩ পরীক্ষায় ৩১৮ জন, অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২২ পরীক্ষায় ৩০৪ জন, অনার্স ২য় বর্ষ-২০২৩ পরীক্ষায় ১৯০ জন এবং অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৩ পরীক্ষায় ১১৯ জন শিক্ষার্থী শাস্তির মুখে পড়েছেন। এমনকি সদ্য শুরু হওয়া অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৪ পরীক্ষাতেও ইতোমধ্যে ৮৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই অনার্স পর্যায়ের। মাত্র ছয়টি অনার্স পরীক্ষায় শাস্তি পেয়েছেন ১ হাজার ২৭২ জন শিক্ষার্থী, যা মোট দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রায় ৪৯ শতাংশ। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ঘটছে চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। অনার্স ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের তিনটি পরীক্ষায় একাই শাস্তি পেয়েছেন ৯৫৯ জন শিক্ষার্থী, যা অনার্স পর্যায়ের মোট বহিষ্কারের ৭৫ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে ডিগ্রি পাস কোর্সেও নকলের প্রবণতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ছয়টি পরীক্ষায় মোট ৫৩১ জন শিক্ষার্থী দণ্ডিত হয়েছেন। এর মধ্যে ডিগ্রি পাস ৩য় বর্ষ-২০২৩ পরীক্ষায় ১২৩ জন এবং ২য় বর্ষ-২০২৩ পরীক্ষায় ৯৩ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন। এছাড়া পেশাজীবী কোর্স হিসেবে পরিচিত এলএলবি পরীক্ষাতেও ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এলএলবি শেষ পর্ব-২০২২ পরীক্ষায় একযোগে ২৩৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন, যা একক পরীক্ষা হিসেবে অন্যতম সর্বোচ্চ।
শুধু অনার্স বা ডিগ্রি নয়, মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি পর্যায়েও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২২ পরীক্ষায় ১২৭ জন এবং মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২১ পরীক্ষায় ১২৪ জন শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স পরীক্ষাতেও শতাধিক শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার শৃঙ্খলা রক্ষায় ১৯ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করে ছয় ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ কথাবার্তা বলা, মোবাইল বহন বা অননুমোদিত কাগজপত্র রাখার মতো অপরাধে সংশ্লিষ্ট বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। অন্যদিকে মোবাইল ফোন, ব্লুটুথ ডিভাইস বা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে নকল করলে এক বছর পর্যন্ত বহিষ্কারের বিধান রয়েছে। গুরুতর অপরাধ যেমন উত্তরপত্র পাচার, ভুয়া পরিচয়ে পরীক্ষা দেওয়া, শিক্ষক লাঞ্ছনা বা ভাঙচুরের মতো ঘটনায় সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত বহিষ্কারের শাস্তি দেওয়া হতে পারে।
শিক্ষকদের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন নকলের ধরনকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগের মতো শুধু চিরকুট নয়, এখন ক্ষুদ্র ডিজিটাল ডিভাইস, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে পরীক্ষার হলে সরাসরি উত্তর সংগ্রহের চেষ্টা করছে অনেক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও অ্যাকাউন্টিংয়ের মতো বিষয়ে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক শিক্ষক বলছেন, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেয় না এবং পরীক্ষার আগে গাইড বই নির্ভর প্রস্তুতির কারণে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে নকলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
সম্প্রতি পরীক্ষাকেন্দ্রে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অব্যবস্থাপনা ও নকলের চিত্র দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে।
উপাচার্য আরও জানান, শুধু শিক্ষার্থী নয়, খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি করলে শিক্ষকদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। পুনর্মূল্যায়নের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাস করার ঘটনা শিক্ষক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শাস্তি দিয়ে নকল বন্ধ করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায় উচ্চশিক্ষার মান আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।