ইপেপার / প্রিন্ট
ছাত্রলীগ নেতার অভিযোগ—‘৫ লাখ টাকা চেয়েছে’, ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বললেন জেলার
জুয়েল হাসান সাদ্দাম
বাগেরহাট: জামিনে কারামুক্ত নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম তার কাছে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছেন বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেল সুপার খোন্দকার মো. আল-মামুনের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ নাকচ করে জেল সুপার বলেছেন, টাকার জন্য নয়, কারারক্ষীদের হুমকি, অন্য বন্দীকে মারধরসহ একাধিকবার কারা-অপরাধের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে তাকে অবস্থানের জন্য যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাতে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা এলাকায় স্ত্রী-সন্তানের কবর জিয়ারত শেষে জেলারের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেন জুয়েল হাসান সাদ্দাম।
তিনি বলেন, “বাগেরহাটের জেল সুপার আমার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেছেন।
যদি বাগেরহাটে থাকতে হয়, ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। ৫ লাখ টাকা দিতে না পারার কারণেই আমাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেল সুপার খোন্দকার মো. আল-মামুন।
সাদ্দাম বন্দীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ১৫ দিনের স্থানে ৭ দিন এবং ফোনে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিতের দাবি করে বলেন, ‘২৪-এর আন্দোলনটা হয়েছে রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনের জন্য। তাহলে আজকে রাষ্ট্র কাঠামোটা কোথায়? আমি আমার সন্তানের লাশ ধরতে পারছি না। রাষ্ট্র আমাকে অধিকার দেয়—আমি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সন্তান-স্ত্রীর পাশে থাকতে পারবো। আজকে স্ত্রী-সন্তানের লাশের বিনিময়ে কি তাহলে জামিনটা হলো?’
বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা এলাকার একরাম হাওলাদার ও দেলোয়ারা একরাম দম্পতির ছেলে জুয়েল হাসান সাদ্দাম।
তিনি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ সংগঠন) সভাপতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। পরে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল গোপালগঞ্জ থেকে সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল আদালতের নির্দেশে সাদ্দামকে বাগেরহাট জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। ২২ জুলাই ২০২৫ বাগেরহাট থেকে তাকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
সেই থেকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে ছিলেন তিনি।
এদিকে বাগেরহাট কারাগারের নথি অনুযায়ী, বন্দী অবস্থায় গত বছরের ১২ মার্চ তিনি একজন সেল ইনচার্জকে (বাদশা মিয়া) হুমকি দেন এবং গালাগাল করেন। ৬ জুলাই অপর এক বন্দীকে মারধর করেন।
চাঁদা দাবির বিষয়ে সাদ্দামের অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ উল্লেখ করে বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেল সুপার খোন্দকার মো. আল-মামুন বলেন, ‘তার আচরণের কারণেই তাকে যশোরে পাঠানো হয়। এখানে অন্য কোনো ঘটনা নেই। আর জেল সুপার চাইলেই কাউকে অন্য জেলে স্থানান্তর করতে পারে না। এ ধরনের ভিত্তিহীন কথার আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, কারারক্ষীদের হুমকি, অন্য বন্দীকে মারধরসহ একাধিকবার কারা-অপরাধের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে তাকে অবস্থানের জন্য যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। বাগেরহাট কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি সবসময় আমাদের স্টাফদের এবং আশপাশের বন্দীদের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও ভয়ভীতি দেখাতেন। এই ধরনের আচরণের মধ্যেই তিনি ছিলেন।
গত ২৩ জানুয়ারি দুপুরে সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের বাড়ি থেকে তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) ও ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরের দিন ২৪ জানুয়ারি দুপুরে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও ছেলের লাশ সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সুবর্ণার বাবার বাড়িতে আনা হয়। সেখানে গোসল শেষে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় তাদের মরদেহ। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন সাদ্দাম।
ওই দিন স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্বর্ণালীর বাবার বাড়ির কবরস্থানে তার ও তার ছেলের পাশাপাশি দাফন সম্পন্ন হয়।
স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও তিনি প্যারোলে মুক্তি না পাওয়ায় দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। যদিও এ ঘটনায় ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় থেকে একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বন্দীর স্ত্রী ও সন্তান মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করে জেল গেটে মরদেহ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে উচ্চ আদালত তাকে জামিন দেয়। যশোর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি রাতে তিনি বাড়িতে আসেন। স্ত্রী-সন্তানের কবর জিয়ারতের পর সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে কিছু সময় অবস্থান করেন সাদ্দাম। সেখান থেকে প্রথমে মোটরসাইকেল এবং পরে সাদা হাইয়েস গাড়িতে করে দ্রুত চলে যান নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ওই নেতা।