ইপেপার / প্রিন্ট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এর অপব্যবহারের আশঙ্কাও। বিশেষ করে পরীক্ষায় নকলের নতুন মাধ্যম হিসেবে এআই-সমৃদ্ধ স্মার্ট চশমা বা এআই গ্লাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষায় দুই পরীক্ষার্থীকে এআই চশমা ব্যবহারের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। দেশটিতে প্রথমবারের মতো পরীক্ষায় এ ধরনের স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে তাইওয়ানেও। দেশটির মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় এক পরীক্ষার্থীর আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তার চশমা পরীক্ষা করেন। পরে দেখা যায়, চশমাটি অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত ছিল এবং এতে ইলেকট্রনিক উপাদান সংযুক্ত ছিল। এরপর পরীক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষার নিরাপত্তা জোরদার করেছে চীন। দেশটির জাতীয় কলেজ ভর্তি পরীক্ষা ‘গাওকাও’-তে পরীক্ষার্থীদের ব্যবহৃত সব ধরনের চশমা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেন, ফলে প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এআই চশমায় সাধারণত ক্ষুদ্র ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, প্রসেসর এবং ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে। পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্রের দিকে তাকালে ক্যামেরা প্রশ্নের ছবি ধারণ করতে পারে। এরপর সেই তথ্য স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলে পাঠানো হয়।
এআই প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করতে পারে। চশমার ধরনের ওপর নির্ভর করে উত্তরটি ক্ষুদ্র ডিসপ্লেতে দেখানো, সংযুক্ত মোবাইলে পাঠানো বা গোপন অডিও ডিভাইসের মাধ্যমে শোনানো সম্ভব।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে থাকা সব এআই চশমায় ব্যবহারকারীর চোখের সামনে সরাসরি উত্তর ভেসে ওঠার সুবিধা নেই। অনেক স্মার্ট গ্লাস মূলত ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, ভয়েস কমান্ড ও এআই সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তৈরি হয়েছে। তাই পরীক্ষায় জালিয়াতির সক্ষমতা নির্ভর করে ব্যবহৃত ডিভাইস ও সফটওয়্যারের ওপর।
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক মেং জিল্লি বাজারে পাওয়া এআই চশমা নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা পরিচালনা করেন। তার পরীক্ষায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট ধরনের স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে প্রশ্নের ছবি এআই মডেলে পাঠিয়ে দ্রুত উত্তর পাওয়া সম্ভব।
তিনি ১০০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে একটি মক পরীক্ষা পরিচালনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, এআই চশমা ব্যবহারকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তুলনামূলক ভালো ফল করেন। তবে গবেষণাটি প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরলেও বাস্তব পরীক্ষায় এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার আইন ও পরীক্ষার বিধিমালার পরিপন্থী।
শিক্ষাবিদদের মতে, এআই-নির্ভর ডিভাইস যত সহজলভ্য হবে, পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। তাই বিভিন্ন দেশে পরীক্ষাকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ডিভাইস শনাক্তকরণ, চশমা পরীক্ষা, সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতিকে থামানো সম্ভব নয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পরীক্ষা পরিচালনার পদ্ধতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।