ইপেপার / প্রিন্ট
ব্রিজ, ফ্লাইওভার কিংবা মেট্রোরেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি নয়—বাংলাদেশের রাজনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত মানুষ আদৌ নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারছে কি না। উন্নয়নের নামে যদি নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত অধিকার উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন—এমন মন্তব্য করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে পরিবেশ, রাজনীতি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির এখন প্রয়োজন একটি ‘সারভাইভাল ম্যানিফেস্টো’, যেখানে উন্নয়নের আগে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার নিশ্চয়তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে সপরিবারে বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ড. কামরুজ্জামান ঢাকাকে একটি ‘মৃত্যুকূপ’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক পর্যায়ে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে ভয়াবহ অবহেলা বিদ্যমান, যা প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
তিনি বলেন, নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায় না। গণভবনে থাকা মানুষ ও কড়াইল বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ—উভয়েই একই দূষিত বাতাস গ্রহণ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈষম্যহীন দূষণের দায় রাজনীতি কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না।
নগর জীবনের অনিরাপদ বাস্তবতা তুলে ধরে ড. কামরুজ্জামান বলেন, আজকের ঢাকা শহরে ফুটপাতে নিরাপদে হাঁটার পরিবেশ নেই। মাথার ওপর ঝুলে থাকে নির্মাণাধীন ভবনের ইট, নিচে থাকে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। এমন বাস্তবতাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন বলা যায় না।
বিগত বিভিন্ন সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একাধিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও সাধারণ মানুষের নিরাপদ বসবাস ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কখনোই অগ্রাধিকার পায়নি। তিনি ‘অর্নামেন্টাল ডেভলপমেন্ট’ বা প্রদর্শনমূলক উন্নয়নের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ফ্লাইওভার ও মেট্রোর ভিড়ে শহরের খোলা জায়গা, শ্বাস নেওয়ার পরিবেশ ও নাগরিক স্বস্তি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশভিত্তিক প্রকল্পে দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. কামরুজ্জামান বলেন, এসব প্রকল্পে নেওয়া ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়, অথচ প্রকৃত সুফল তারা পায় না। এতে পরিবেশ রক্ষা তো হয়ই না, বরং জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ে।
আগামী রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখে তিনি একটি ‘গ্রিন ক্লিন ম্যানিফেস্টো’ বা সবুজ ইশতেহারের দাবি জানান। তার মতে, রাজনীতিবিদদের বক্তব্য আবেগনির্ভর নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের আগে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু ক্যান্সার হাসপাতাল বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে সেটি ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থারই প্রতিফলন।
ভোটারদের উদ্দেশে ড. কামরুজ্জামান বলেন, যারা ভোট চাইতে আসবেন, তাদের কাছ থেকে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার আদায় করতে হবে—শব্দদূষণমুক্ত এলাকা, যানজট নিরসন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ দূষণ কেবল প্রাকৃতিক সংকট নয়; এটি সরাসরি একটি রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
শেষে তিনি বলেন, আগামী যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রধান অঙ্গীকার হতে হবে একটি সবুজ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যারা পরিবেশগত নিরাপত্তার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে, জনগণ শেষ পর্যন্ত তাদেরই সমর্থন দেবে।