ইপেপার / প্রিন্ট
মেহেরপুরে কয়েক বছর যাবৎ বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেচ ব্যবস্থায় পাট আবাদ করেছিলেন চাষিরা। ভালো লাভের আশায় পাট চাষ করলেও কাঙ্ক্ষিত ফলনে বিপর্যয় ও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ চাষিরা। চাষিরা বলছেন, এ বছর পাটের আঁশ কম এবং দামও কম। খরচের টাকা উঠছে না। পাটের মূল্যবৃদ্ধি না হলে আগামীতে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলে জানিয়েছেন তারা।
পাট চাষিরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে মেহেরপুর জেলায় অনাবৃষ্টি ও প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে পাটের আবাদে উৎপাদন খরচ হয়েছে দ্বিগুণ। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন বিপর্যয় ঘটেছে। পাটের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক চাষি পাটের আবাদ ছেড়ে দিয়েছেন। এ বছরেও অনেক চাষি পাটের আবাদ করেছেন বুকভরা আশা নিয়ে। কিন্তু সে ‘গুড়ে বালি’ এবছরেও পাটের ফলন হচ্ছে না, আবার দামও কম। পাট উৎপাদনে যে টাকা খরচ হয়েছে তা উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে আর পাট চাষ করবেন না বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মেহেরপুরের গাংনী, মুজিবনগর, সদরসহ মোট তিনটি উপজেলায় ১৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। জেলায় এ বছর ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৬ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জমি থেকে পাট কেটে পুকুর ডোবা কিংবা জমিতেই স্যালো মেশিন দিয়ে পানির ব্যবস্থা করে পাট পচানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় পাটের রং হচ্ছে কালো। এতে দাম কম পাচ্ছেন পাট চাষিরা। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের পাটের আঁশ তুলনামূলক কম ও রঙের পার্থক্য থাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাট ব্যবসায়ীরা জানান, এবছর শুকনা পাট বিকিকিনি চলছে ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা।
গাংনী উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামের পাটচাষি ইদ্রিস আলী জানান, তিনি চৈত্র মাসের শেষের দিকে দুই বিঘা জমিতে পাট বীজ রোপণ করেছিলেন। অতি খরার কারণে দুই দিন পরপর সেচ দিতে হতো। নিড়ানি, সার, বিষসহ প্রতিবিঘা জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু এখন পাট কেটে পচানো থেকে শুরু করে আঁশ ছাড়ানো পর্যন্ত যে খরচ হচ্ছে তা উঠছে না।
মাইলমারি গ্রামের পাটচাষি হবিবর রহমান বলেন, এক বিঘা জমির পাট কাটতে এবং বহন করে পুকুরে পচানো পর্যন্ত খরচ হচ্ছে ৫ হাজার টাকা। সেই পাট আঁশ ছাড়াতে শ্রমিক খরচ হচ্ছে ৩ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে পাট হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ মণ। প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ১৯শ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়। কাঁচা পাট বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। এতে আমাদের খরচের টাকা উঠছে না। পাটকাঠি বিক্রি করে খরচের টাকা তুলতে হচ্ছে।
ষোলমারি গ্রামের পাটচাষি ছহিরুদ্দিন বলেন, তিন বছর যাবৎ পাটের আবাদ করে লোকসান গুনতে হয়েছে। এবছরেও লোকসান হচ্ছে। আগামীতে আর পাটের আবাদ করবো না। অন্য আবাদে ফিরে যাব।
ভাটপাড়া গ্রামের পাটচাষি আব্দুল আলিম বলেন, ভারতের মহারাষ্ট্র জাতের পাট লম্বা হয় সাত থেকে আট ফুট। কিন্তু এবছর অনাবৃষ্টির কারণে পাট বাড়তে পারেনি। চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা হয়েই পাট জমিতে শুকিয়ে গেছে। যার ফলে পাটে ফলন কম। এবং আঁশ হয়েছে পাতলা। যদি পাটের ন্যায্যমূল্য থাকতো তাহলে এতেই পুষিয়ে যেত।
পাটের আঁশ ছাড়ানো শ্রমিক লোকমান হোসেন জানান, সকাল ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পাটের আঁশ ছাড়ানোর মজুরি ৬০০ টাকা। প্রায় একমাস ধরে পাট সংগ্রহের ভরা মৌসুম। চাষিরা দাম পেলে আমাদেরও ভালো লাগে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাটের ফলন কম এবং ওজন হচ্ছে না। পাট মোটা না হওয়ায় আঁশ ছাড়ানোর শ্রমিক লাগছে বেশি।
নওয়াপাড়া গ্রামের পাট ব্যবসায়ী আফিরুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন, কালিগাংনীর শহিদুল ইসলাম, গোপালনগর গ্রামের ব্যবসায়ী আজমাইন হোসেন জানান, শুকনা পাটের বর্তমান বাজার মূল্য ১ হাজার ৯৫০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা। কাঁচা পাট বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা বেল। মেহেরপুরের পাট বড় না হওয়ায় পাটের চাহিদা কম। এখন পর্যন্ত পাট কিনছি। কিন্তু বিক্রি করতে পারছি না। পাট শুকিয়ে গোডাউনে রেখে দিচ্ছি। আগামীতে দাম পেলে বিক্রি করবো। আর যদি দাম আরও কমে যায়, তবে লোকসান হবে।
পাট ব্যবসায়ী ইন্দাদুল হক বলেন, নদী এলাকার পাটের দাম ভালো। কিন্তু মেহেরপুর জেলায় খাল-বিল বা পুকুরে পানি না থাকায় পাটের রং সোনালি হওয়ার পরিবর্তে কাদাযুক্ত কালো হচ্ছে। যার ফলে এখানকার পাটের চাহিদা একেবারেই কম। পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ কোনো কোম্পানি পাট কিনতে চাচ্ছে না।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিজয় কৃষ্ণ হালদার বলেন, আমাদের মেহেরপুর জেলায় অনাবৃষ্টির কারণে পাট বাড়তে পারেনি। আঁশ হয়েছে পাতলা। ওজনও কম হচ্ছে। খালবিলে পাট পচানোর জন্য পানি না পেয়ে কৃষকরা গর্ত করে সেচ দিয়ে পাট পচানোর ব্যবস্থা করছেন। এতে পাটের যে প্রকৃত রং, তা হচ্ছে না। ফলে নদী এলাকার পাটের তুলনায় দাম কম পাচ্ছেন। তারপরেও সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাট পচানো এবং আঁশ সংগ্রহে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।