ইপেপার / প্রিন্ট
গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেছেন, ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত যে গোপন বন্দিশালায় তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে বাস্তবে কোনো আয়না ছিল না।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বেঞ্চে এদিন দ্বিতীয় দিনের মতো হাসিনুর রহমানের জেরা অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অপর সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকীর পক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষীকে জেরা করেন।
জেরার একপর্যায়ে আয়নাঘর নামের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসিনুর রহমান বলেন, ‘নেত্র নিউজের এডিটর ইন চিফ তাসনিম খলিলের মাধ্যমে “আয়নাঘর” শব্দটি প্রথম গণমাধ্যমে আসে।’ তবে তিনি জানান, বন্দিশালার ভেতরে কোনো আয়না ছিল না, যদিও ওই স্থাপনাকে আয়নাঘর নামেই ডাকা হতো।
সাক্ষী বলেন, আয়নাঘরে মোট ১০টি সেল ছিল, যেগুলোকে রিমান্ড সেল বলা হতো। এর একটিতে তাকে আটক রাখা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মাথায় কাপড় বা জমটুপি পরানো হতো বলেও তিনি জানান।
প্রথম দফায় গুম হওয়ার পর কতদিন তাকে আটক রাখা হয়েছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনুর রহমান বলেন, নির্দিষ্ট তারিখ মনে না থাকলেও প্রথম দফায় তাকে ৪৩ দিন গুম করে রাখা হয়। ওই সময় তাকে আর্মি ইন্টারোগেশন সেলে রাখা হয়েছিল এবং অধিকাংশ সময় তার চোখ বাঁধা থাকত। কেবল বাথরুমে নেওয়ার সময় চোখ খুলে দেওয়া হতো, তবে হাতে হাতকড়া পরানো থাকত।
তার সামরিক পরিচয় ও পদোন্নতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে শুরু করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই পদোন্নতি পান। মেজর হিসেবে মিলিটারি পুলিশে এবং পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে বিডিআরের দুটি রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া র্যাব-৫ ও র্যাব-৭–এর অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানান তিনি।
দ্বিতীয় দফায় গুমের পর ডিজিএফআই সদর দপ্তরে যাওয়া প্রসঙ্গে সাক্ষী বলেন, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি ডিজিএফআই ভবনে যাননি। তবে ৫ আগস্টের পর একবার ডিজিএফআইয়ের ডিজির ভবনে এবং প্রসিকিউটরের সঙ্গে একবার আয়নাঘরে গিয়েছেন। ওই দিন তিনি বন্দিদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে সেখানে যান বলেও উল্লেখ করেন।
আয়নাঘরে আটক থাকার সময় কক্ষের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কক্ষটির উচ্চতা আনুমানিক ১৬ থেকে ১৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১২ ফুট এবং প্রস্থ ৮ থেকে ১০ ফুট ছিল। আসামিপক্ষের আইনজীবী এ বক্তব্যকে মিথ্যা দাবি করলে সাক্ষী তা অস্বীকার করেন।
এ সময় আইনজীবী দুলু অভিযোগ করেন, সাক্ষী প্রসিকিউশনের শেখানো বক্তব্য অনুযায়ী সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তবে হাসিনুর রহমান তা ‘সত্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
উল্লেখ্য, এর আগে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালে অবশিষ্ট সাক্ষ্য সম্পন্ন করেন হাসিনুর রহমান। তার জবানবন্দি শুরু হয় ২৫ জানুয়ারি। তিনি এ মামলার দুই নম্বর সাক্ষী। এর আগে প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
এদিন মামলার গ্রেপ্তার তিন আসামিকে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন—ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
এ মামলায় মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জন পলাতক। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ২৬ জনকে গুম করার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়।