ইপেপার / প্রিন্ট
তিনি বলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করা। তাই বাঙালী জাতিকে পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত করার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনাতেই সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কথা সন্নিবেশ করে দেন। তিনি বিচার প্রক্রিয়ায় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান সন্নিবেশিত করেন। এসব নীতি ও বিধান অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে ধনী বা আর্থিক সামর্থ্যবান নাগরিকদের পাশাপাশি দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলেও স্বাধীনতার পর প্রায় তিন দশকেও দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারে আইনগত সহায়তা প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক কোন কাঠামো চালু হতে দেখা যায়নি। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার পেতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে সরকারী খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান করার জন্য ২০০০ সালে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ প্রণয়ন করে দেন। একই সঙ্গে সরকারী আইনী সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ নামে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত বছর এই আইনের বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যায়। এরপর ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করলে আইনী সহায়তা কার্যক্রমকে গতিশীল ও সেবাবান্ধব করার লক্ষ্যে ঢাকায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয় এবং এর অধীনে প্রত্যেক জেলায় লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপনসহ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, চৌকি আদালত এবং শ্রম আদালতে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম চালু করা হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসসমূহে একজন করে সিনিয়র সহকারী জজ/সহকারী জজকে লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। আইনী সহায়তা কার্যক্রমকে গতিশীল ও দরিদ্রবান্ধব করার লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করা হয়। সরকারী আইনী সেবা প্রদান আরও বিস্তৃত ও সহজ করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে টোল ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৪৩০ চালু করা হয়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আইনী সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে বিডি লিগ্যাল এইড এ্যাপ চালু করা হয়। মামলা জট কমানোর লক্ষ্যে বর্তমানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোকে ‘এডিআর কর্নার’ বা ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ জন্য ২০১৫ সালে ‘আইনী পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বিধিমালা প্রণয়ন করে লিগ্যাল এইড অফিসারদের এডিআর বা বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির আইনী ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এ ক্ষমতাকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দেওয়ানি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করা হয়। এডিআর কার্যক্রমকে গতিশীল করতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসসমূহে নতুন করে ৯৬টি সহায়ক কর্মচারীর পদ সৃজন করা হয়েছে। সরকারী- বেসরকারী সংস্থার যৌথ উদ্যোগে সরকারী আইনী সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্যানেল আইনজীবী ও অন্যদের জন্য নিয়মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। সরকারী আইনী সেবার যাবতীয় তথ্য ও কার্যক্রম ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘লিগ্যাল এইড অফিস ম্যানেজমেন্ট সফট্ওয়্যার’ নির্মাণ করা হয়েছে। এ সফটওয়্যারে কাজের সুবিধার্থে প্রতিটি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে ১টি করে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, স্ক্যানার, ওয়েবক্যাম, প্রজেক্টর, কম্পিউটার টেবিল এবং হটলাইন হিসেবে ব্যবহারের জন্য সিমকার্ডসহ একটি অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সফটওয়্যারটি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মকারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ২০১৮ সালে সংস্থার প্রধান কার্যালয়সহ ৬৪টি জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, সুপ্রীমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থাপিত ০২টি শ্রমিক আইন সহায়তা সেলে বিটিসিএল- এর মাধ্যমে উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। সংস্থার সকল অফিসের জন্য অফিসিয়াল ই-মেইল তৈরি করা হয়েছে। সেরা লিগ্যাল এইড অফিস, সেরা প্যানেল আইনজীবী ও সেরা বেসরকারী সংস্থাকে উৎসাহ/প্রণোদনা হিসেবে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ করা হয়েছে। দেশের আপামর জনসাধারণের আইনী অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধা বঞ্চিত নাগরিককে সরকারী আইনী সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ কার্যকরের তারিখ অর্থাৎ, ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতিবছর ২৮ এপ্রিল জাতীয়ভাবে আইনগত সহায়তা দিবস উদ্যাপন করা হচ্ছে। মূলত ছয়টি উদ্দেশ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন করা হয়। যথাÑ (১) সরকারী আইনী সেবা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা, (২) দরিদ্র ও অসহায় জনগণের ন্যায় বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, (৩) জনগণকে আইনগত অধিকার বিষয়ে সচেতন করা, (৪) সরকারী আইন সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর, বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা, (৫) সরকারী ও বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার (এনজিও) যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আইন সহায়তা কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করা এবং (৬) লিগ্যাল এইড অফিসারের মধ্যস্থতায় গতানুগতিক আইনী প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা ও দীর্ঘসূত্রতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিকল্প উপায়ে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যকার বিরোধ বা মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করে লিগ্যাল এইড অফিসকে ‘এডিআর কর্নার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারী আইনী সেবা প্রচার ও প্রসার ঘটানো। এই উদ্দেশ্যগুলোকে সামনে রেখে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতি বছর আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপন করা হয়। আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা সত্ত্বেও সমাজের পিছিয়ে পরা একটি জনগোষ্ঠী সরকারী আইনী সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে এখনও অন্ধকারে আছেন বা তাঁদের এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই। এরা মূলত তৃর্ণমূল পর্যায়ের নিরক্ষর, অসচেতন, অবহেলিত, সহায়-সম্বলহীন এবং সুবিধা বঞ্চিত মানুষ। তাঁরা আইনগত অধিকার সম্পর্কে ততটা সচেতন নয়। আমরা যারা সমাজের সচেতন ব্যক্তি তাঁরা নানা ব্যস্ততা, অবহেলা, আত্মমর্যাদা, প্রতিহিংসা, অনীহা, অর্থব্যয়ের ভয় কিংবা অপর পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে এমন ভয়ে ওইসব সহায়-সম্বলহীন এবং সুবিধা বঞ্চিত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াই না। এমনকি সরকার যে বিনামূল্যে তাঁদের আইনী সহায়তা দেয় তাও তাঁদের জানাই না। ফলে তাঁরা হচ্ছেন শোষিত ও বঞ্চিত। আমরা যদি তাঁদের পাশে দাঁড়াই তাহলে তাঁরাও তাঁদের যতটুকু সামর্থ্য আছে তা নিয়েই আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। এর ফলে একদিকে যেমন সমাজে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে অন্যদিকে সামাজিক অন্যায়, অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয় কমে যাবে এবং সামাজিক শান্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। তবে শুধু সরকারের উদ্যোগে আইনগত সহায়তা প্রদান আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজের সকলের বিশেষ করে বিজ্ঞ বিচারক, আইনজীবী, এনজিওকর্মী, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং মিডিয়াকর্মীর আন্তরিক সহযোগিতা খুব প্রয়োজন। তাই আসুন আমরা সকলে মিলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণের পাশে দাঁড়াই। তাঁদের সরকারী আইনী সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করি এবং আইনগত সহায়তা প্রদান আইনের মহৎ উদ্দেশ্যগুলো সফল করি। লেখক : মোহাম্মদ রবিউল