ইপেপার / প্রিন্ট
রোমানিয়ায় রুশ ড্রোন হামলা: ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রে প্রথম সরাসরি আঘাত, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র রোমানিয়ার ভূখণ্ডে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (তারিখ) পূর্ব রোমানিয়ার সীমান্তবর্তী শহর গালাতিতে একটি বেসামরিক ১১ তলা আবাসিক ভবনে আঘাত হানে একটি ড্রোন। রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় ভবনটির আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং একজন নারী ও একজন শিশু আহত হয়েছেন। তবে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়।
রোমানিয়া ন্যাটো জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র এবং দেশটির সঙ্গে ইউক্রেনের প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। হামলার শিকার গালাতি শহরটি ইউক্রেন সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রাতের দিকে বিস্ফোরকবাহী ড্রোনটি ভবনটিতে আঘাত হানে। হামলার পরপরই জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে তদন্ত শুরু করেছে এবং ড্রোনটির উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণে কাজ করছে।
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র ও প্রেস সচিব দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে অবহিত করা হয়েছে। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা দাবি করেছেন, এই হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তিনি ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে রাশিয়ান সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপ-প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ড্রোন হামলার ঘটনা আরও ঘটতে পারে এবং এর ফলে ইউরোপের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সীমান্তবর্তী ন্যাটো দেশগুলোতে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনা ঘটলেও সরাসরি আবাসিক ভবনে আঘাত হানার ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক। এটি রাশিয়া-ন্যাটো সম্পর্কের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া ইস্যু এবং মিনস্ক চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চলছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর থেকে টানা কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ চললেও এবারই প্রথম কোনো ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের ভেতরে সরাসরি এমন হামলার ঘটনা সামনে এলো।
ঘটনার পর ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, “রাশিয়ার বেপরোয়া আচরণ পুরো ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ন্যাটো তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ইঞ্চি ভূমি রক্ষায় প্রস্তুত এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম।”
তিনি আরও জানান, হামলার পর রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসর ড্যানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ন্যাটো মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা ইউক্রেন যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনাও নতুন করে বৃদ্ধি পেতে পারে। এখন বিশ্বজুড়ে নজর রয়েছে রোমানিয়ার তদন্ত প্রতিবেদন এবং ন্যাটোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।