ইপেপার / প্রিন্ট
কুড়িগ্রামে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে জনরোষ: মানববন্ধন শেষে টোলঘর ভাঙচুর, ব্রহ্মপুত্র রক্ষায় ৬ দফা দাবি
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং নদীভাঙন থেকে জনপদ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশ শেষে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ফকিরেরহাট এলাকায় অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি টোলঘর গুঁড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (৩০ মে) দুপুরে চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরেরহাট বাজার এলাকায় ‘সচেতন তরুণ সমাজ ও এলাকাবাসী’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নদী বিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপল-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. তুহিন ওয়াদুদ। এছাড়াও বক্তব্য দেন অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রভাষক নিহারিকা শারমিন, ফকিরেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন, চিলমারী উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য খন্দকার বদরুল ইসলাম রাঞ্জু, সহকারী অধ্যাপক আকতারা লিপি, শিক্ষার্থী শাহজালাল, আশিক ইকবাল ইশাত, রফিকুল ইসলাম রতনসহ ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা।
বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহল ও একটি সিন্ডিকেট রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে এবং রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের হাজারো মানুষের বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও কৃষিজমি হুমকির মুখে রয়েছে।
তারা আরও বলেন, শুধু অবৈধ বালু উত্তোলনই নয়, নদী রক্ষার জন্য স্থাপন করা পিসি ব্লক ও অন্যান্য সুরক্ষা অবকাঠামোও চুরি ও অপসারণ করা হচ্ছে। এতে করে ব্রহ্মপুত্রের তীর আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় জনগণ বহুবার মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
মানববন্ধন থেকে আন্দোলনকারীরা ব্রহ্মপুত্র নদ রক্ষায় ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা, পরিবেশসম্মত ও পরিকল্পিত নদী খনন নিশ্চিত করা, ফকিরেরহাট থেকে কাঁচকোল পর্যন্ত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীতীর রক্ষায় টি-বাঁধ, পিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ স্থাপন, ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং অবৈধ বালু উত্তোলন ও সরকারি সম্পদ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে প্রভাষক নিহারিকা শারমিন বলেন, “স্বাধীনতার এত বছর পরও জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমরা উন্নয়ন চাই, সরকারকে রাজস্ব দিতে চাই; কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে, নদীকে হত্যা করে কোনো উন্নয়ন হতে পারে না। একটি কণা বালুর ক্ষেত্রেও আমরা আপস করবো না।”
অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “শুধু অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করলেই হবে না। ব্রহ্মপুত্র নদকে টেকসইভাবে রক্ষা করতে আধুনিক ও যান্ত্রিক নদী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।”
মানববন্ধন শেষে উত্তেজিত এলাকাবাসী ফকিরেরহাট এলাকার কয়েকটি অবৈধ টোলঘরে হামলা চালিয়ে সেগুলো ভেঙে ফেলে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলে নজরদারি বাড়ায়।
এলাকাবাসী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ব্রহ্মপুত্র নদ রক্ষার এই আন্দোলন এখন স্থানীয় জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।