ইপেপার / প্রিন্ট
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের কোনো সুস্পষ্ট প্রাক্কলন নেই—এমন মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনটি বলেছে, আর্থিক পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে ইশতেহারগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে সুজন আয়োজিত ‘কোন দলের কেমন ইশতেহার’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
লিখিত বক্তব্যে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, ইশতেহারগুলোতে ভালো কথার ফুলঝুড়ি থাকলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রবাসীদের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত।
তিনি বলেন, এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের মতো বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে—সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা নেই। যদিও সব দলই সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে, তবে নির্বাচনে বিজয়ী দল কতটা ইশতেহার বাস্তবায়ন করে তা নাগরিক সমাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানান তিনি।
দিলীপ কুমার সরকার আরও বলেন, ইশতেহারগুলোর একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো কর্মসূচির আর্থিক প্রাক্কলনের অভাব। নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কত অর্থ প্রয়োজন এবং সে অর্থ কোন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে—ইশতেহারে তার কোনো স্পষ্ট বিবরণ নেই।
সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাসী। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা একটি পূর্বশর্ত। দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে না পারলে করের হার কমিয়ে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হবে কিনা—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে করের আওতা সম্প্রসারণ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে লোকসান কমাতে পারলে ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়।
অন্যদিকে বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুত এক কোটি কর্মসংস্থান, ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মতো প্রকল্পগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করা হয়। কৃষক কার্ডের আওতায় ভর্তুকির পরিমাণও স্পষ্ট নয়, ফলে এতে কত রাজস্ব ব্যয় হবে তা নির্ধারণ করা কঠিন বলে জানায় সুজন।
এ সময় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, করের আওতা বহুগুণে সম্প্রসারণ না করলে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধনীদের করের জালে আনতে গেলে বিত্তশালীদের প্রতিরোধের মুখে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এবারের ইশতেহারগুলোতে একটি বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু দল নীতি-নৈতিকতার ওপর জোর দিয়েছে, আবার কিছু দল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেমন ‘ফ্যামিলি কার্ড’-কে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে প্রায় সব ইশতেহারই ভালো কথার ফুলঝুড়িতে সাজানো।
কোন দলের ইশতেহার সবচেয়ে ভালো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে কোনো একটি দলকে সেরা বলা সম্ভব নয়। একেক মানুষের কাছে একেক ইশতেহার ভালো মনে হতে পারে। বরং খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে প্রতিটি ইশতেহারের শক্তি ও দুর্বলতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। জনগণের কাছে ইশতেহারের বিষয়বস্তু পরিষ্কারভাবে তুলে ধরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।