দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই কর্মসূচিতে জালিয়াতি, ভুয়া তথ্য প্রদান এবং অনিয়ম প্রতিরোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর প্রণীত ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়ায় এসব প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকারের সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যক্তি নয়, পরিবারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
এআই দিয়ে অসঙ্গতি শনাক্ত
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ভূমি মন্ত্রণালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে এপিআই সংযোগের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হবে।
এছাড়া গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনে সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক অসঙ্গতি, দ্বৈত নিবন্ধন, আয়-সম্পদের গরমিল বা ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে এআই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নারীর নামে ইস্যু হবে কার্ড
পরিবারে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড সংশ্লিষ্ট পরিবারের মা বা জ্যেষ্ঠ উপযুক্ত নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। কোনো কারণে কার্ডধারী নারী মৃত্যুবরণ করলে পরিবারের অন্য উপযুক্ত নারী সদস্যের নামে কার্ড স্থানান্তরের সুযোগ থাকবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা কমিটির অনুমোদন নিয়ে পরিবারের পুরুষ প্রধানের নামেও কার্ড ইস্যু বা স্থানান্তর করা যাবে।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপকারভোগী নির্বাচন
প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করতে ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ (পিএমটি) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এ পদ্ধতিতে পরিবারের আয়, সম্পদ, জীবনযাত্রার মান এবং আর্থসামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে একটি স্কোর নির্ধারণ করা হবে।
এই স্কোরের ভিত্তিতে পরিবারগুলোকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হবে। অতি দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, দরিদ্র পরিবারগুলো অগ্রাধিকার পাবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারগুলো এই কর্মসূচির বাইরে থাকবে।
যেসব পরিবার সুবিধা পাবে না
নীতিমালায় একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা বর্জন তালিকার কথাও বলা হয়েছে। এর আওতায় জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ, চার চাকার গাড়ির মালিকানা, করযোগ্য আয়, বড় ব্যবসা কিংবা নির্ধারিত সীমার বেশি জমির মালিক পরিবারগুলো ফ্যামিলি কার্ডের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া সরকারি, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং নিয়মিত সরকারি পেনশন গ্রহণকারী ব্যক্তিদের পরিবারও সাধারণত এই সুবিধা পাবে না।
থাকবে নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন
ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের তথ্য নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনরায় যাচাই করা হবে। কোনো পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে এবং তারা নির্ধারিত সীমার ওপরে চলে গেলে তাদের কর্মসূচি থেকে ‘গ্রাজুয়েট’ করা হবে। এরপর সেই স্থানে নতুন যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এ লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও জিও-লোকেশনভিত্তিক সমন্বিত পরিবার জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবারকেন্দ্রিক করতে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি বাস্তবায়ন শুরু হবে।