ইপেপার / প্রিন্ট
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর–এ শুরু হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৃহৎ যৌথ অভিযান। সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ছয়টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সকাল থেকেই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন। অভিযান চলাকালে কেউ যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথেই তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন জানান, ভোর থেকে অভিযান চলছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের অবৈধ সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরকে “দেশের ভেতরে আরেক দেশ” বলা হতো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে স্থায়ীভাবে বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অভিযানে অংশ নেওয়া বাহিনীর মধ্যে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ, ৩৩০ জন এপিবিএন সদস্য, ৪০০ জন র্যাব সদস্য এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আকাশপথে নজরদারির জন্য ড্রোন ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি মাটির নিচে বা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক শনাক্ত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াডও কাজে লাগানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এটি সবচেয়ে বড় সমন্বিত অভিযান। মূলত গত ১৯ জানুয়ারি অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭–এর নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার পর থেকেই সরকার এই এলাকায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানা–এ একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে **মোহাম্মদ ইয়াসিন**কে। এছাড়া **নুরুল হক ভান্ডারী**সহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিদের ধরতে গেলে ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় আটক এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা হাজারো অবৈধ বসতির জন্য পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য এবং দখলকে কেন্দ্র করে সেখানে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এলাকায় প্রধানত দুটি গ্রুপ সক্রিয়—একটির নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন।
ইয়াসিন আগে স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী–এর অনুসারী বলে দাবি করেন। যদিও র্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনার পর আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং এ ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত নয়।
অভিযান চলমান থাকায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অপরাধী ও সশস্ত্র গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।