অনিয়ম, লুটপাট ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে সংকটে পড়া ছয়টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আর্থিক সূচকে উন্নতির সুযোগ দিতে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থতা, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এবং গুরুতর মূলধন ঘাটতি—এই তিনটি সূচকের ভিত্তিতে আগে নয়টি এনবিএফআইকে ‘অব্যবহারযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং—এই ছয় প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)–এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এখনই অবসায়নে না গিয়ে আর্থিক অবস্থার উন্নতি প্রমাণের জন্য ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অনিয়মের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। সন্তোষজনক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নয়টি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের উদ্যোগের আওতায় আনা হয়।
অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গত সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে উপস্থাপিত কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে তিন প্রতিষ্ঠানকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক, যা পর্ষদে অনুমোদিত হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে এসব এনবিএফআই কার্যত ধ্বংসের মুখে পড়ে। আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত পিকে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফাস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, অবসায়নের তালিকায় থাকা নয়টি রুগ্ন এনবিএফআইয়ের ব্যক্তি আমানতকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে, রমজানের আগেই, তাদের মূল টাকা ফেরত পাবেন। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের কাজ শুরু করা হবে। মূল্যায়নের পর শেয়ারহোল্ডারদের পাওনা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য সরকার মৌখিকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে। তবে আমানতকারীরা কেবল তাদের জমা দেওয়া মূল অর্থই ফেরত পাবেন, কোনো সুদ দেওয়া হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সমস্যাগ্রস্ত নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে রয়েছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া অ্যাভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে আছে।
বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে এনবিএফআই খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা।