রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং ভয়াবহ জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত ইরাক। সেই দেশেও যে ফুটবলের এমন উন্মাদনা থাকতে পারে সম্ভবত সেটি ভাবনাতেও ছিল না গ্রাহাম আরনল্ডের। এই অস্ট্রেলিয়ান যখন ইরাক ফুটবল দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব নিচ্ছিলেন, তখন বলা হচ্ছিল তাদেরকে বিশ্বকাপে তোলা হবে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজের একটি। সেই দলটি এখন বিশ্বকাপ থেকে কেবল এক ম্যাচের দূরত্বে!
আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফের ফাইনালে আগেই উঠেছিল ইরাক। তাদের প্রতিপক্ষও চূড়ান্ত হয়েছে। লাতিন দেশ বলিভিয়াকে হারাতে পারলে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেবে ইরাক। আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে তাদের ৪০ বছরের অপেক্ষা ঘুচবে। ইরাকের কোচ আরনল্ডের মতে– ‘এই চাকরি নেওয়ার আগে, আমাকে বলা হয়েছিল সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম কঠিন কাজ এটি। ৪০ বছর ধরে ইরাক বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। প্রচন্ড চাপ সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে যেখানে ৪৬ মিলিয়ন মানুষ ফুটবল-আসক্ত।’
৩১ মার্চ মেক্সিকোর মন্টেরিতে প্লে-অফ ফাইনালে লড়বে ইরাক-বলিভিয়া। সেখানে জিতলে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান কোচ হিসেবে দুটি ভিন্ন দলের হয়ে বিশ্বকাপে কোচিং করাবেন গ্রাহাম আরনল্ড। এর আগেরবার তিনি বিশ্বকাপে তুলেছিলেন নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়াকে। আরনল্ড বলেন, ‘আমি সেই স্মরণীয় মুহূর্তটি স্মরণ করি, ২০০৫ সালে যখন সকারুরা (অস্ট্রেলিয়া) বিশ্বকাপে ওঠে। যার প্রভাব পুরো দেশে পড়েছিল। ইরাকেও সবার ধমনীতে একই রক্ত বইছে এবং তারা খেলার প্রতি খুব আবেগী। বছরের পর আমার কোচিং কিংবা ইরাকের বিপক্ষে খেলার সুবাদে, তাদের শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছি, ভাবুন তো সেই দল কি না ৪০ বছর ধরে বিশ্বকাপের বাইরে।’
কেন এত বছর ধরে ইরাক বিশ্বকাপে উঠতে পারছে না তাও অজানা নয়– রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। যেখানে হস্তক্ষেপ চালায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ফাঁসি কার্যকর করে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের। এর চার বছর পর (২০০৭) এশিয়ান কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় ইরাক, কিন্তু এরপরও ফুটবলে ফের পতন ঘটে দেশটির। বাইরের আলোচনা থেকে দূরে রাখতে ইরাকি ফুটবলারদের সামাজিক মাধ্যমের বাইরে রাখেন কাচ আরনল্ড। গত নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে জায়গা করে নেওয়ার পথে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে স্টপেজ টাইমের গোলে হারিয়ে উল্লাসে মাতে পুরো ইরাক। বিশ্বকাপে উঠতে পারলে সেই উন্মাদনা কতদূর পৌঁছায় সেটাই ভাবছেন কোচ আরনল্ড।
সাবেক এই অজি কোচ বলেন, ‘এখানে আমার চাকরির ১০ মাসের মধ্যে বেশিরভাগ সময় (৭ মাস) বাগদাদে কাটিয়েছি। কারণ আমি তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চাই। আমি কোথাও যেতে পারি না কিংবা কোনো সামাজিক জীবন নেই– কারণ কোথাও গেলে সবাই মবের মতো ঘিরে ধরে এবং তারা ছবি তুলতে চায়। (আরব আমিরাত ম্যাচ জয়ের পর) আমি ফুটেজ দেখেছি, বাগদাদে তারা রাস্তায় নেমে পতাকা হাতে বড় জমায়েত নিয়ে উদযাপন করেছে। তাদের আবেগ ব্যাপক এবং খেলা শেষে আমি বলছিলাম যে, আমরা এখনও কোয়ালিফাই করিনি। দেশের জন্য সেটিও করতে এই খেলোয়াড়রা খুব নিবেদিত।’