বৃহস্পতিবার , ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

২০২৬ সালের নির্বাচন হবে ভবিষ্যতের জন্য মাইলফলক: প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

প্রকাশিত হয়েছে- বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, এটি জাতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। আমরা নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব—এটাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। ২০২৬ সালের নির্বাচন যেন ভবিষ্যতে আদর্শ নির্বাচন হিসেবে উদাহরণ হয়ে থাকে, সে লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে।”

তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন যেন কোথাও কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ থেকেই ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং ভোটের দিন হবে এই প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্ব।

ড. ইউনূস স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাই এখন সর্বোচ্চ নির্দেশ। সব বাহিনী ও প্রশাসনকে ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেবে, তবে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সারাদেশের পরিস্থিতি সরাসরি মনিটরিং করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তাই আমাদের প্রস্তুতিও হতে হবে সর্বোচ্চ মানের।

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি বিবেচনায় একটি শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও সুন্দর নির্বাচন সম্ভব। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখছেন—আশা করি, তারা শেষ পর্যন্ত এই অবস্থান ধরে রাখবেন।”

বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রায় ৩০০ জনের একটি পর্যবেক্ষক দল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

তিনি বলেন, আজ মধ্যরাত থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে। তবে সাইবার স্পেসে অপতথ্য ও গুজব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালট গণনায় কিছুটা বেশি সময় লাগবে—এ নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়াতে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ভোটের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।

সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি আনতে বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বলেন, প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে, যাতে কোনো অনিয়ম বা জোরজবরদস্তি না হয়।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্র প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবে। স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি বলেন, ভোটের চার দিন আগে থেকে সব বাহিনী মাঠে থাকবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন দায়িত্ব পালন করবে। বডি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে।

বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে নির্বাচন ঘিরে নিয়মিত ও ঘন ঘন এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি জানান।