একটি ভালো জীবনের আশায় ঘর ছেড়েছিলেন। পরিবারকে দারিদ্র্যের কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নিল না। পূর্ব আফ্রিকার পথ পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার বিপজ্জনক যাত্রায়, ভূমধ্যসাগর-এর বুকে অনাহার ও তৃষ্ণায় মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জের তরুণ মুহিবুর রহমানের।
মুহিবুর রহমান ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মো. নুরুল আমিনের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরেছিলেন তিনি। দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করে কোনোভাবে চললেও, পরিবারের জন্য স্বচ্ছল ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলার এক দালালের সঙ্গে চুক্তি করেন মুহিবুর। পরে তাকে লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে গ্রিস পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। একই স্বপ্ন বুকে নিয়ে আরও কয়েকজন তরুণ এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অংশ নেন।
গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে উদ্বেগে পড়ে যায় মুহিবুরের পরিবার। বারবার দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো নিশ্চিত তথ্য পায়নি তারা। অবশেষে সোমবার (৩০ মার্চ) একই নৌকায় থাকা আরেক যুবক মারুফ আহমদ গ্রিস থেকে মুহিবুরের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
মারুফ আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকায় খাদ্য ও পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় অনাহারে থেকে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন যাত্রীরা। সবার আগে মৃত্যু হয় মুহিবুর রহমানের। এরপর একে একে আরও কয়েকজন প্রাণ হারান। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, মরদেহগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে জীবিতরা বাধ্য হয়ে সেগুলো সাগরের মাঝেই ফেলে দেন।
এই নির্মম ঘটনার খবর পৌঁছানোর পর মুহিবুরের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মা মহিমা বেগম বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। ছোট ভাই হাফিজুর রহমান অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। বাবা নুরুল আমিন স্তব্ধ—ছেলের এমন মর্মান্তিক পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
এ ঘটনায় স্থানীয় এলাকাজুড়ে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে সর্বস্তর থেকে। সচেতন মহল বলছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ ধরনের অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে ডিপ্লোমেসি চাকমা, ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জানান যে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং দ্রুত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্নকে পুঁজি করেই দালালচক্রগুলো এ ধরনের মানবপাচারের ফাঁদ বিস্তার করছে। তাই এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ—দুটিই সমানভাবে জরুরি।