মিলেমিশে পাথর লুটপাটের অডিও ভাইরাল, নেপথ্যে জলিল
পুলিশকে রাতের বেলায় চাঁদার টাকা তুলার পরামর্শ দিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আব্দুল জলিল। সংবাদকর্মীর পরিচয় খাটিয়ে দীর্ঘদিন যাবত পুলিশের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসছে সে। সাম্প্রতিক সময়ে পাথরবাহী ট্রাক্টর থেকে চাঁদা আদায় করতে পুলিশকে পরামর্শের কথোপকথনের একাধিক অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাড়ির সদ্য সাময়িক বহিষ্কৃত ইনচার্জ কামরুল আলমের সাথে পাথর লুটপাটে সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করার একাধিক অডিও ক্লিপ প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে। একটি অডিও ক্লিপে শুনা যায়, আব্দুল জলিল পুলিশের উপ পরিদর্শক কামরুল আলমকে পরামর্শ দেন, “আফনে এক খাম (কাজ) খরুইন (করেন), ওউ রাত্রে হেরা (তারা) যিখানো (যেখানে) তুলের (টাকা) অখানের (সেখানে) মাঝে টেখা (টাকা) তুলইন (তুলেন)”। হেরা টেখা তুলিয়া আফনারে দেউক।
জবাবে কামরুল আলম, আব্দুল জলিলকে বলেন” আমি যদি আলুঘাট দিয়া যেসময় আফনারা আমারে কইছিলেন যে আলুঘাটা দিয়া রাস্তা দিলাইন রাত্রে তিনটা থেকে চারটা পাঁচটা ছয়টা তিন ঘন্টা বা দুই ঘন্টা, আমি যদি ঐ সময় লাইন দিতাম তাইলে আমিও আজকে পঞ্চাশ লাক টেখার মালিক অইতাম, আপনারাও মোটামুটি সবাই শান্তিতে থাকতেন।”
আরেকটি অডিও ক্লিপে বলতে শুনা যায়, আব্দুল জলিল ইনচার্জ কামরুল আলমকে বলেন, তারা (কথিত সংবাদকর্মীরা) আইছে তারারে… এ সময় কামরুল আলম বলেন, তারারে সম্মানি ইয়ত, শান্তনা দিলাম, শান্তনা দিলাম তো। এ সময় আব্দুল জলিল বলেন, কোয়াই টেখা কোয়াই। এরপর কামরুল আলম বলেন, নাই নাই নাই। সত্যি নাই। পালটা অনুরোধে জলিল বলেন, কোন সময় দিবা? কালকে অও বেটারে আর লগে আমারেও রাখবা।
সংবাদ প্রকাশ না করার শর্তে আব্দুল জলিলকে প্রায়শই উপঢৌকন দিতেন এসআই কামরুল আলম। উপঢৌকন দেওয়ার প্রমাণাদি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তেমন একটি অডিও ক্লিপে কামরুল আলম অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে বলতে শুনা যায়, কালকে এই বেল্ট আইন্না দিছি, আজকে আমার বিরুদ্ধে নিউজ করে। এমন মানুষ আর এ পৃথিবীতে আছে কি না! সেই বেল্টের ছবি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অনৈতিক লেনদেনের এসব অডিও ক্লিপ ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে বিভিন্ন কু-কর্মের সম্পৃক্ত গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অপরাধে সম্পৃক্ত কয়েকজন সংবাদকর্মীর জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে মুখরোচক মন্তব্য শুরু হওয়ায় অনেকটা বাকফুটে হয়ে গেছেন বলে জানান কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ কবির আহমদ। তিনি আরও জানান, গণমাধ্যমকর্মীরা অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে গেলে অপরাধকে অনুনাষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার তুল্য মনে করি। অনৈতিক কার্জকলাপে জড়িত হওয়ার কারনে আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে শাহ আরফিন টিলার পাথরের গর্ত থেকে চাঁদা উত্তোলন ও বিভিন্ন ক্রাশার মিলে চোরাই পাথর বিক্রি করতে ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। পাথরবাহী ট্রাক্টর পরিবহনে পুলিশি ঝামেলা রহিতকরণে মাসোহারা পদ্ধতি চালু করেন। যারা পুলিশ ও কথিত সংবাদকর্মীদের মাসোহারা দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের ট্রাক্টর পুলিশ ফাড়িতে আটকের একাধিক তথ্য প্রমাণাদি রয়েছে। শুধু তাই নয়, আটককৃত ট্রাক্টর ছাড়িয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ ট্রাক্টর প্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অডিও ক্লিপ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। একটি অডিও ক্লিপে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাড়ির সদ্য বহিষ্কৃত ইনচার্জ কামরুল আলমকে আব্দুল জলিল পরামর্শ দিচ্ছেন, জালিয়ার পাড় গ্রামের মৃত শুক্কুর আলীর পুত্র পাথর ব্যবসায়ী কালা মিয়ার গাড়ি যেন আটক করেন।
এদিকে ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাড়ির সাবেক ইনচার্জ আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাথরবাহী ট্রাক্টর থেকে চাঁদা উত্তোলনের লাইন দেওয়ার জন্য আব্দুল জলিল তাকে চাপ সৃষ্টি করেছেন। অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে আজকের খবর নামে একটি ফেসবুক পেইজে আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে। সেই পেইজের এডমিন আব্দুল জলিল নিজে।
পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে দফারফা হওয়ায় পেইজ থেকে সেই ভিডিও ডিলিট করে দেয়। যার প্রমাণ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত।
গত কয়েক মাস পূর্বে ঝুকিপূর্ণ ধলাই ব্রীজের নিচ থেকে বালু পাথর ও কালাইরাগ এলাকা থেকে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দেয়। সেই মামলায় নাম কাটানোর শর্তে নীরিহ ব্যক্তিদের কাছ থেকে আব্দুল জলিল চক্র প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। মত প্রকাশে বিরোধিতা করায় অসংখ্য নীরিহ ব্যক্তিকে মামলার জালে ফাসিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার তথ্য মিলে। অনলাইন এক্টিভিস্ট তাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি জানান, ধলাই ব্রীজের নীচ থেকে পাথর ও বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করা আব্দুল জলিল আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাসায়।
খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন বালু ও পাথর অদ্ধুষিত স্থান থেকে লুটপাট এবং অনৈতিক সুবিধা আদায় করতে একটি অসাধু সাংবাদিক চক্র গড়ে তুলেছে এই আব্দুল জলিল। সেসব স্থান থেকে বালু পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময় অর্থ আদায় করেন। লম্বাকান্দি গ্রামের আব্দুল মান্নান নামের এক বালু ব্যবসায়ী জানান, কাঠালবাড়ি শিমুলতলা ও গুচ্ছগ্রাম এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করতে গেলে কথিত সংবাদকর্মীদের মাসোহারা দিতে হয়। না দিলে নিউজ হবে বলে ভয় দেখায়।
অডিও ক্লিপে নিজের বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সদ্য বহিষ্কৃত পুলিশের উপ-পরিদর্শক কামরুল আলম।