বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের ফেরাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে আলোচনা, জল্পনা আর অপেক্ষা। মাসখানেকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে তাকে আবার জাতীয় দলে ফেরানোর বিষয়ে নানা পর্যায়ে তোড়জোড় দেখা গেলেও বাস্তবতা এখনো বদলায়নি। পাকিস্তান সিরিজের পর আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজেও বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ককে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রশ্নটা আবারও সামনে চলে এসেছে—সাকিবের ফেরা কি শুধুই সময়ের অপেক্ষা, নাকি এখনো রয়েছে বড় কোনো অনিশ্চয়তা?
সম্প্রতি বিসিবির বোর্ড সভা শেষে পরিচালক ইফতেখার রহমান মিঠু স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, সাকিবের জাতীয় দলে ফেরা অনেকটাই নির্ভর করছে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার কার্যক্রম এবং সেটির অগ্রগতির ওপর। অর্থাৎ, ক্রিকেটীয় প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেগুলো এই মুহূর্তে তার ফেরার পথে প্রভাব ফেলছে। বোর্ডের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, সাকিবকে নিয়ে আগ্রহ থাকলেও সিদ্ধান্তটি এককভাবে ক্রিকেট বোর্ডের হাতে নেই।
মঙ্গলবার পূর্বাচলে ভেন্যু পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন,
‘সাকিবের বাংলাদেশে আসা এবং বাংলাদেশে আসার পর আমাদের নির্বাচকরা যদি মনে করে সাকিব খেলার জন্য তৈরি, খেলবে। আর আসাটার তো আপনারা জানেন যে এখানে বেশ কিছু অন্যান্য প্রক্রিয়াগত ঝামেলা আছে, সেগুলো তো ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে নেই।’
বিসিবি সভাপতির এই বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, সাকিবের জন্য জাতীয় দলের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়। দ্বিতীয়ত, তার দলে ফেরা কেবল নির্বাচকদের পছন্দ বা টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করছে না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু বহিরাগত প্রক্রিয়াগত জটিলতাও। ফলে বোর্ড চাইলেই তাকে সঙ্গে সঙ্গে দলে টেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসান জাতীয় দলে খেলা, দেশের ক্লাব ক্রিকেটের অস্থিরতা, নিজের দেশে ফেরা এবং রাজনীতি—এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তার সেই বক্তব্য দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাজনীতি প্রসঙ্গে তার মন্তব্য নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু হয়। পরে বিষয়টি পরিষ্কার করতে নিজের ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন সাকিব।
সেই পোস্টে সাকিব জানান, এই মুহূর্তে তার পুরো মনোযোগ শুধুই ক্রিকেটে। জাতীয় দলের হয়ে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ অংশটুকু সেরাভাবে খেলতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়,
‘সম্প্রতি গণমাধ্যমে আমার একটি বক্তব্য বেশ আলোচনা তৈরি করেছে। আমি সবার কাছে বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে চাই। এই মুহূর্তে আমার পুরো মনোযোগ শুধুই ক্রিকেটে। ক্যারিয়ারের এই শেষ পর্যায়ে এসে আমি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ উজাড় করে খেলতে চাই এবং সুযোগ পেলে দেশকে কিছু দারুণ পারফরম্যান্স উপহার দিতে চাই।’
রাজনীতি প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন দেশের অন্যতম সফল এই ক্রিকেটার। তিনি বলেন, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশসেবার একমাত্র পথ রাজনীতি নয়। ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পর দেশের উন্নয়নে নিজের ভূমিকা রাখতে চান তিনি, তবে সেটা কীভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্যই রেখে দিয়েছেন। তার বক্তব্য ছিল,
‘একটি দেশের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর, আমি আমার দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই। তবে সেটা যে শুধু রাজনীতির মাধ্যমেই করতে হবে, তা নয়। রাজনীতি ছাড়াও দেশের জন্য কাজ করা সম্ভব। তবে হ্যাঁ, রাজনীতির মাধ্যমে কাজগুলো করা হয়তো অনেক বেশি সহজ হয়।’
সবশেষে সাকিব তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে আবেগঘন প্রত্যাশার কথাও জানান। তিনি লিখেছেন,
‘আমি আশা করি লাল-সবুজের জার্সি গায়ে মুখে হাসি নিয়ে আমি আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করতে পারব। এই লক্ষ্যে আমি বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে দোয়া ও ভালোবাসা প্রার্থী।’
সাকিবের এই বার্তায় পরিষ্কার—সমালোচনা, আলোচনা এবং বিতর্কের ভেতরেও তিনি এখনো জাতীয় দলের হয়ে খেলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, তার জাতীয় দলে ফেরার রাস্তা এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। মাঠে নামার মতো প্রস্তুত থাকলেও, দেশের মাটিতে এসে দলের অংশ হতে হলে তাকে পেরোতে হবে প্রক্রিয়াগত কয়েকটি ধাপ। বোর্ডও সেটিই ইঙ্গিতে-ইঙ্গিতে বারবার জানিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ দলের জন্য এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। কারণ, সাকিব আল হাসান শুধু একজন ক্রিকেটার নন; তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের অভিজ্ঞতা, ভারসাম্য এবং বড় মঞ্চে আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তার উপস্থিতি এখনো বাংলাদেশ ক্রিকেটে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও হলো, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দলের কম্বিনেশন এবং নতুনদের সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে সময় কাউকে অপেক্ষা করে না। তাই সাকিবের ফেরার এই অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, ততই প্রশ্ন বাড়বে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কেমন হতে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে বিসিবির অবস্থান একদম পরিষ্কার—সাকিব দেশে ফিরতে পারলে, এবং নির্বাচকরা যদি মনে করেন তিনি খেলার জন্য প্রস্তুত, তাহলে তাকে বিবেচনায় আনা হবে। কিন্তু সেটি কবে সম্ভব হবে, সেই উত্তর এখনো ধোঁয়াশার ভেতরেই রয়ে গেছে। ফলে আপাতত নিউজিল্যান্ড সিরিজে তাকে ছাড়া পরিকল্পনা সাজাচ্ছে বাংলাদেশ দল, আর সমর্থকেরা অপেক্ষা করছেন—লাল-সবুজের জার্সিতে সাকিবকে আরেকবার দেখা যাবে কি না।