সরকারকে পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় থাকতে হলে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের পথ বেছে নিতে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আহত কিশোর আলিফ চৌধুরীকে দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম জানান, হবিগঞ্জে হামলার শিকার আলিফের একটি চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। অন্য চোখটিও গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ওই চোখে দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে অন্য চোখের অবস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকদের বোর্ড সভার পর তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান তিনি।
আলিফের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, হামলার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে তার খোঁজ নেওয়া হয়নি। তার দাবি, ভিডিও ফুটেজে হামলার সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট এবং হবিগঞ্জ সদর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিবও হামলায় জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় মামলা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, সরকার এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাসীরা দিনের আলোয় হামলা করলেও তাদের বিচার হবে না। তার দাবি, হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিকে ঘিরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রায় এক হাজার লোক জড়ো হলেও পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আলিফের ওপর হামলা এবং সারজিস আলমের গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে হলে এতক্ষণে পদত্যাগ, ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা দল থেকে বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকলেও দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না।
অভিভাবকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, আজ আলিফের চোখ নষ্ট হয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো শিশুও এমন হামলার শিকার হতে পারে। তার অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করা না গেলে তারা আইন ও বিচারব্যবস্থাকে তোয়াক্কা করবে না এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সিলেটের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম, সাভার ও কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এনসিপি, ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক মত দমনের চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আলিফের একটি বক্তব্য তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কাঁটা গলায় বিঁধে যাওয়ার আগেই কাঁটা তুলে ফেলতে হয়। বিঁধে গেলে অনেক ক্ষতি হয়।’
সরকারের মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যদি মনে করে এভাবে পাঁচ বছর পার করবে, তাহলে সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। তার দাবি, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না।
এ সময় সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং সিএনজি গ্যাসের দাম ৪২ টাকা থেকে ৬৫ টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে পেট্রোবাংলা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশে বিনিয়োগ কমছে, শিল্প-কারখানাগুলো বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে এবং ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি দল পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাই ১৮ কোটি মানুষের দেশ পরিচালনাও তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
আলিফের চিকিৎসা ও ন্যায়বিচারের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি সরকারের কাছে বিচার, ক্ষতিপূরণ বা সহানুভূতি প্রত্যাশা করে না। তবে বাংলাদেশের জনগণ, গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আলিফের পাশে রয়েছে। সরকারের সন্ত্রাসী ও দমন-পীড়নের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।