উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলী ছেলের প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে একবেলা না খেয়ে দিনাতিপাত করা নওগাঁর সেই অসহায় বৃদ্ধ দম্পতি অবশেষে প্রশাসনের সহায়তায় আশার আলো দেখছেন। গত ১৮ মে গণমাধ্যমে “উচ্চশিক্ষিত ছেলের বিরুদ্ধে সম্পত্তি আত্মসাৎ ও নির্যাতনের অভিযোগ, ন্যায়বিচারের আশায় বৃদ্ধ দম্পতি” এবং “চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন অসুস্থ বাবা, খাবারের খোঁজে কাঁদছেন মা” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি দ্রুত নজরে আসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের।
সংবাদ প্রকাশের পর নওগাঁ সদর উপজেলার শৈলগাছী ইউনিয়নের পারবাঁকাপুর গ্রামে ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে ছুটে যান প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
শত কষ্টের মাঝেও প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগ পরিবারটির জন্য এক বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃদ্ধ দম্পতির জরুরি ভরণপোষণের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নিম্নলিখিত সহায়তা প্রদান করা হয়:
আর্থিক অনুদান: চিকিৎসাধীন বৃদ্ধ বাবার জরুরি ওষুধের জন্য নগদ ৫,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা।
খাদ্য সামগ্রী: ঘরে খাবার না থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় রশদ পৌঁছে দেওয়া হয়।
সহায়তা প্রদানের সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে মোঃ হাবিব হোসেন, শৈলগাছী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
“একমাত্র ছেলেকে বুকভরা আশা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বুড়ো বয়সের লাঠি হবে, কিন্তু সে আমাদের পথের ভিখারি করেছে। আজ প্রশাসন এসে পাশে না দাঁড়ালে আমাদের না খেয়ে থাকতে হতো।”
— অশ্রুসিক্ত চোখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন মা মঞ্জোয়ারা বেগম।
ভুক্তভোগী আব্দুল জলিল শেখ (৮৩) আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা হলেও দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে নওগাঁ সদরের শৈলগাছী ইউনিয়নে ২০-২৫ বিঘা জমি কিনে নার্সারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তার একমাত্র ছেলে শেখ আ. রহমান সাইক বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে ব্যবসার অজুহাতে ব্যাংক ঋণের কথা বলে কৌশলে বাবা-মায়ের প্রায় ১৮ বিঘা জমি নিজের নামে লিখে নেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে প্রতারণা বুঝতে পেরে বৃদ্ধ দম্পতি আদালতে মামলা করলে আদালত দলিল বাতিলের একতরফা রায় দেন। এরপর থেকেই শুরু হয় ছেলের নির্মম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। বর্তমানে আব্দুল জলিল শেখ দুই হাঁটুর গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত, যার অপারেশনের জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন।
যদিও অভিযুক্ত ছেলে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, জমি নিয়ম মেনেই রেজিস্ট্রি করা হয়েছে এবং তিনি ভরণপোষণ দিতে প্রস্তুত। তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য জালাল জানান, একাধিকবার সালিশ হলেও ছেলে কোনো সমাধান মানেননি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কেবল খাদ্য বা আর্থিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অসহায় প্রবীণদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, এই বৃদ্ধ দম্পতির চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রশাসন সার্বিক নজরদারি বজায় রাখবে। শেষ বয়সে এসে সন্তানহারা ও সহায় সম্বলহীন এই দম্পতি এখন প্রশাসনের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছেন।