বৃহস্পতিবার , ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সংগ্রামী মা রোকেয়ার জয়গাথা: দারিদ্র্য পেরিয়ে তিন সন্তান আজ রাষ্ট্রসেবায়

প্রকাশিত হয়েছে- শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি, স্বজন হারানোর বেদনা, দারিদ্র্য আর জীবনের কঠিন সংগ্রাম—সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তিন সন্তানকে দেশের সেবায় নিয়োজিত করেছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারার এক সাহসী মা। তিনি রোকেয়া বেগম, যার জীবনগাথা আজ অসংখ্য মায়ের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক।

বারখাইন গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগমের জন্ম ১৯৬১ সালে। ১৯৭১ সালে তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন শুরু হয় মহান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও হত্যাযজ্ঞ তার শৈশবকে নাড়িয়ে দেয়। সেই অস্থির সময়েই থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে বাবার মৃত্যু তার জীবনে গভীর শোক বয়ে আনে। একই বছর তিনি বিয়ে করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিন হোসাইনকে। সংসার জীবনের শুরুতেই দুই কন্যাসন্তানকে হারানোর বেদনাও সইতে হয়েছে তাকে। তবে জীবনসংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি।

পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে এক কন্যা, ১৯৮৬ সালে এক পুত্র এবং ১৯৯১ সালে আরেক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। পরিবারে নতুন স্বপ্নের আলো জ্বললেও ২০০২ সালে স্বামীর মৃত্যু সেই স্বপ্নকে বড় ধাক্কা দেয়। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ অসুস্থতার পর স্বামী মারা গেলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন রোকেয়া বেগম।

স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব পুরোপুরি তার কাঁধে এসে পড়ে। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে তিনি মানুষের বাসায় কাজ করেছেন, অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়েছেন এবং আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিয়েছেন। অনেক সময় না খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে, কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি।

তার দীর্ঘ ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফল আজ সাফল্যের গল্প হয়ে উঠেছে। বড় মেয়ে আইরিন আক্তার ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। ছেলে মোহাম্মদ মইনুল হোসেন চৌধুরীও সরকারি প্রশাসনে কর্মরত। ছোট মেয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করে ৩৯তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন এবং বর্তমানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

মায়ের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে ছেলে মোহাম্মদ মইনুল হোসেন চৌধুরী বলেন, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মা। তার সীমাহীন ত্যাগ, শ্রম ও স্বপ্নই তিন ভাইবোনকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে এবং দেশসেবার সুযোগ করে দিয়েছে।

রোকেয়া বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর এক যুগেরও বেশি সময় অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন কখনও ছেড়ে দেননি। আজ সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত দেখতে পারাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

এই সংগ্রামী মায়ের একমাত্র প্রত্যাশা, তার সন্তানরা যেন দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে এবং সমাজের উপকারে নিজেদের নিয়োজিত রাখে। তার জীবনকাহিনি প্রমাণ করে—অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের কাছে প্রতিকূলতাও একসময় হার মানে।