২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণআন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তির বিধান রেখে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১১তম দিনে স্পিকারের সভাপতিত্বে বিলটি কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ আকারে আইনটি জারি করেছিল, যা এখন সংসদের অনুমোদনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হলো।
দায়মুক্তির মূল বিধান
আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত নতুন কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের আইনত গ্রহণযোগ্য হবে না।
এই বিধান অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা আইনি সুরক্ষা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ব্যতিক্রম
তবে আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যদি কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট কমিশনের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশন অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, তদন্তের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বা সাবেক সদস্যদের তদন্ত দায়িত্ব দেওয়া যাবে না, যদি ভুক্তভোগী ওই বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
তদন্ত চলাকালে কাউকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন হলে কমিশনের পূর্বানুমোদন নিতে হবে। তদন্ত শেষে যদি প্রমাণিত হয় যে ঘটনাটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলকভাবে সংঘটিত হয়েছে, তাহলে কমিশন সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে, যা পুলিশ প্রতিবেদনের সমতুল্য হিসেবে গণ্য হবে।
অন্যদিকে, যদি তদন্তে দেখা যায় যে ঘটনাটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, তাহলে কমিশন চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঘটনার জন্য কোনো আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না।
প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
আইনটি পাস হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে সমর্থকরা বলছেন, এটি গণআন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার ঝুঁকি কমাবে। অন্যদিকে সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এই আইন দায়মুক্তির সুযোগে কিছু গুরুতর অপরাধ আড়াল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনটির সফল প্রয়োগ নির্ভর করবে কমিশনের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ওপর।
উপসংহার
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিল’ দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি একদিকে আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষা দিচ্ছে, অন্যদিকে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি আলাদা তদন্ত কাঠামোও তৈরি করছে। তবে বাস্তব প্রয়োগেই নির্ধারিত হবে—এই আইন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে।