‘ছেলেটা বলছিল, ঈদের সময় বাড়ি এলে আমার জন্য একটা নতুন পাঞ্জাবি আনবে। এখন আমার ছেলেটাই নেই।’—কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের গ্যারেজ মিস্ত্রি মো. জাকির হোসেন।
তার ছেলে রাকিব হাসান, যিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী–এর সদস্য ছিলেন, রাজধানীর মিরপুর–২ নম্বরে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদের আগে বাড়ি এসে বাবার জন্য পাঞ্জাবি কেনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা আর পূরণ করা হলো না।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে বিমানবাহিনীতে এলএসি পদে যোগ দেন রাকিব। তিনি ঢাকার এ কে খন্দকার বিমানবাহিনী ঘাঁটি–তে কর্মরত ছিলেন।
বাবা জাকির হোসেন জানান, ঘটনার আগের দিন রোববার রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন রাকিব বলেছিলেন, এবারের ঈদে বাড়ি এসে বাবার জন্য নতুন পাঞ্জাবি নিয়ে আসবেন।
কিন্তু পরদিনই আসে সেই মর্মান্তিক সংবাদ।
জাকির হোসেন বলেন, ঘটনার রাতে প্রথমে বিমানবাহিনী থেকে ফোন করে জানানো হয় তার ছেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তিনি তখন ভাতিজাকে নিয়ে সিএনজিতে করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথেই আবার ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে এক কর্মকর্তা বলেন, “রাকিব মারা গেছে। ছেলের লাশ কখন নেবেন?”
এই কথাটি শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
রাকিব ছিলেন পরিবারের দুই ছেলের মধ্যে বড়। সংসারের দায়িত্বের বড় অংশই তার ওপর ছিল। বাবা জানান, ছোট ভাই এবার এইচএসসি পরীক্ষায় এ-প্লাস পেয়েছে। রাকিবের স্বপ্ন ছিল ছোট ভাইকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করা এবং পরিবারের জন্য একটি নতুন ঘর তৈরি করা।
বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলে রাকিব সবসময় বলতেন, আগে পরিবারের জন্য একটি ঘর তুলবেন, তারপর বিয়ের কথা ভাববেন।
এদিকে একই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন বিমানবাহিনীর আরেক সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা। তিনিও কুর্মিটোলার এ কে খন্দকার বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন এবং প্রোভস্ট শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। তার গ্রামের বাড়ি সৈয়দপুর উপজেলার নিচু কলোনী বিমানবন্দর পূর্বপাড়া এলাকায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চার বছর আগে বিমানবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন অনন্যা। ঘটনার দিন তিনি মিরপুরের ওই বাণিজ্যিক ভবনের একটি শপিং মলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ আগুন লাগলে অনেকের সঙ্গে তিনিও ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা তাকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল–এর বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতেই তার মৃত্যু হয়।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর–২ নম্বরে অবস্থিত ‘এলএ প্লাজা’ নামের ১১ তলা বাণিজ্যিক ভবনে সোমবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে আগুন লাগে। প্রথমে চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে, পরে আরও দুটি ইউনিট যোগ দিলে মোট ছয়টি ইউনিট আগুন নেভাতে অংশ নেয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে তা পুরোপুরি নিভে যায়।
আগুন লাগার পর ভবনের ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। অনেকেই আতঙ্কে ভবনের ছাদে উঠে যান। ফায়ার সার্ভিসের টার্ন টেবিল ল্যাডার ব্যবহার করে ছাদ ও বিভিন্ন তলা থেকে ১৪ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীসহ মোট ২৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তবে রাকিব ও অনন্যা ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা গেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে দুইজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
একটি স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ গড়ার পথেই ছিলেন রাকিব ও অনন্যা। কিন্তু একটি অগ্নিকাণ্ড সেই স্বপ্নকে থামিয়ে দিল। আর রেখে গেল পরিবারগুলোর হৃদয়ভাঙা স্মৃতি—যেখানে এখনো ভেসে আসে সেই প্রশ্ন, “লাশ কখন নেবেন?”।