বৃহস্পতিবার , ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

রিপোর্টের পেছনের গল্প

প্রকাশিত হয়েছে- সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পাঠক প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনেক ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে পারেন। সেই প্রতিবেদন তুলে আনতে রিপোর্টারকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় কিংবা অনেকটা সময় লেগে থাকতে হয়। পাঠক প্রতিবেদনে ভেতরের খবর জানলেও প্রতিবেদনের পেছনের গল্প থাকে অজানা। ঢাকা পোস্টের পাঁচ বছর পূর্তির দিনে ক্রীড়া বিভাগে বিগত পাঁচ বছরের কয়েকটি আলোচিত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের গল্প তুলে ধরা হলো।

ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাসহ দেশ ও জাতির অনেক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানের শুধু শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে নয়, ক্রীড়াঙ্গনেও রয়েছে অসামান্য অবদান। বছর আট-নয় আগে বাফুফের প্রয়াত সাবেক সহ-সভাপতি সাবেক তারকা ফুটবলার ও ডাকসুর সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক বাদল রায়ের বাফুফের কক্ষে ক্রীড়া সাংবাদিকদের বৈকালিক আড্ডা প্রায়ই জমত। সেই আড্ডায় বাদল দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্রীড়াঙ্গনের নানা গল্প বলতেন। জাহাঙ্গীরনগরে পড়াশোনা করলেও সেই থেকে ডাকসু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আলাদা একটা আগ্রহ জন্মায়।

ঢাকা পোস্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর মাস চারেকের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন ছিল। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২৫-২৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শতবর্ষ ও ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে প্রতিবেদনের পরিকল্পনা মাথায় আসে। ঐ সময় করোনায় আবার বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাবেক সাঁতারু শাহজাহান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে গেলাম। ক্রীড়াঙ্গনে শতবর্ষে অর্জন নিয়েই মূলত প্রতিবেদনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ঐতিহ্য ব্লু। সেই তালিকা নিয়ে ফিরলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য ডিআরইউ বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড অর্জন।
শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র থেকে যে তালিকা পেলাম সেখানে ডাকসু ক্রীড়া সম্পাদক বাদল রায়, সাবেক হকি খেলোয়াড় সাজেদ আদেলসহ আরো অনেকের নাম ছিল না। সেটা চোখে পড়ার পর আরও অনুসন্ধানের ইচ্ছে জাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়াঙ্গনে অনেক ট্রফি জিতেছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে জাতীয় পর্যায়ের অর্জনও রয়েছে। সেই ট্রফির কি অবস্থা? একে তো করোনা এর ওপর আবার অফিস বন্ধ। এজন্য আরেক দিন যেতে হলো শারীরিক শিক্ষা অফিসে। পরিচালক শাজাহান আলী ঘুরে ঘুরে ট্রফি দেখিয়েছিলেন। দেখা গেল অনেক ট্রফিই নেই। ব্লু’র সঠিক হিসাব নেই, ট্রফি হারিয়ে যাওয়া, ক্রীড়াবিদ ভর্তি প্রক্রিয়া, ক্রীড়া অবকাঠামো ও ডাকসু না থাকায় ক্রীড়াঙ্গন মোট পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে ব্লু’র সঠিক হিসেব নেই এবং অনেক যোগ্য ক্রীড়াবিদ ব্লু পাননি আবার অনেকে পেয়েছেন নানা বিবেচনায়। এই প্রতিবেদনটি ক্রীড়া ও শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়।

মাস দু’য়েক পর মালদ্বীপে সাফ ফুটবল। টুর্নামেন্ট কাভার করতে প্রতিবেদকও মালদ্বীপে। রিপোর্টারদের সর্ববৃহৎ সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড সার্কুলার হয় সেই সময়। ডিআরইউতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নানা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। মূল প্রতিবেদনে সম্পাদকের স্বাক্ষর, রিপোর্টার-প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যতীত শুধু রিপোর্ট কয়েক কপি প্রিন্ট। দেশের বাইরে থাকায় এই ঝক্কি বয়েছিলেন ঢাকা পোস্টের সহকর্মী জসিম উদ্দিন ও বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের অফিস সহকারী ওমর ফারুক।

মালদ্বীপে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট কাভার করে এসেই দেশে ক্রীড়াঙ্গনের রিপোর্টে ব্যস্ত। মিরপুর সুইমিংপুলে জাতীয় সাঁতার কাভার করছি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খানের ফোন,‘অভিনন্দন; প্রিন্ট-অনলাইন ক্যাটাগরিতে বেস্ট স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ড হিসেবে মনোনীত।’ আত্মপ্রকাশের আট মাসের মধ্যে এই পুরস্কার ক্রীড়াঙ্গন ও গণমাধ্যমে বাড়তি পরিচিতি দেয় ঢাকা পোস্টকে। ইচ্ছে ছিল শতবর্ষে ঢাবি ও ক্রীড়াঙ্গন প্রতিবেদনটি ক্রীড়া লেখক ও সাংবাদিকদের বৈশ্বিক সংগঠন এআইপিএসে আবেদন করার। কাজের ব্যস্ততায় আর সেটা হয়নি।

ম্যাচ, সংবাদ সম্মেলন, মিটিং কাভার ছাড়াও সাবেক খেলোয়াড়, ফেডারেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আড্ডা-আলোচনা প্রায়ই হয়। নড়াইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু প্রায়ই বলতেন, ‘জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক নিষ্ক্রিয় সংগঠন।’ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গে জড়িত আরও অনেকেই এমন বলতেন। সেই থেকে মাথায় আসল লিঙ্গের ভিত্তিতে ক্রীড়া সংস্থা অন্য কোনো দেশে সেভাবে নেই, বাংলাদেশে থাকলেও আদৌ নারী ক্রীড়াঙ্গনে কি ভূমিকা রাখে। মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, সাবেক বর্তমান খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনা করে ২০২২ সালের ৮ মার্চ থেকে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক করি। সেই প্রতিবেদনটি দেশে কোনো সাংবাদিক সংগঠনে স্বীকৃতি না পেলেও এআইপিএস মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে ইয়ুথ রিপোর্টার্স রাইটিং ক্যাটাগরিতে এশিয়ার প্রথম হয়েছিল।

পেশাগত কারণে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে প্রতিনিয়তই যাওয়া পড়ে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পুরাতন ভবনের নিচতলায় এবং নতুন ভবনের আট তলায় ক্রীড়া সঙ্গীতের সাইনবোর্ড রয়েছে। ক্রীড়াসঙ্গীতের সাইনবোর্ড থাকলেও কখনো বাজতে শুনিনি। ক্রীড়াসঙ্গীত কেন বাজে না, কিভাবে এর জন্ম সেটা জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কর্মকর্তাদের সহায়তায় ২-১ দিনের মধ্যেই ৫০ বছর আগের নথি দেখতে পারি। এই ক্রীড়াসঙ্গীতের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠিত জুরি বোর্ড, জমা পড়া গান সব দলিল লিখলাম। অনেক কঠিন বিষয় একেবারে সহজ রূপান্তর। ক্রীড়াসঙ্গীতের পটভূমি, এক সময় চর্চিত সঙ্গীত এখন কেন নেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তা, দুই প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে আলাপ করে প্রতিবেদন করলাম। ক্রীড়াঙ্গনে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। অনেক দেশেই ক্রীড়াসঙ্গীত নেই, বাংলাদেশে থেকেও নেই খানিকটা ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন এআইপিএস মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে আবেদন করি। এবার রাইটিং কলাম ক্যাটাগরিতে এশিয়ার শীর্ষ রিপোর্টে জায়গা করে নেয়।

ফুটবল ফেডারেশন এখন মতিঝিলের আরামবাগে। জাতীয় স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আংশিক অফিস রয়েছে। ফেডারেশনের কোন অফিসে কোন ট্রফি সেটা জানার চেষ্টা করলাম। তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগের কাছে সেই মুহূর্তের কোনো তালিকা ছিল না। কিছু দিন সময় নিয়ে তালিকা তৈরি করলেন। সেই তালিকায় নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই ট্রফি ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে চার জাতির চ্যাম্পিয়ন ও ঢাকায় ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নের ট্রফি। ঐতিহাসিক দুই ট্রফির হদিস নেই প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালে গ্লোবাল ইনভেস্টগেটিভ জার্নালিজমে মার্চ মাসের তালিকায় জায়গা পায়।

শৈশব-কৈশোর কেটেছে ক্রিকেট প্রেমে। বিশেষ করে লঙ্কান ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ভক্ত। খেলাকে ভালোবেসে খেলা নিয়ে লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া। পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার পর ক্রিকেট নিয়ে লেখা হয় একেবারে কদাচিৎ। ফুটবল, জিমন্যাস্টিক্সসহ অন্য সকল খেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেক সম্পৃক্ততা ও সাফল্য। সেখানে ক্রিকেট এত জনপ্রিয় হওয়ার পরও খেলাটি যেতে পারেনি অনেকের কাছে। ‘পড়েনি ক্রিকেটের আলো’ প্রতিবেদনটি অত্যন্ত আলোচিত হয়। ভাষা, খাবার, পোষাক এত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনন্য সাফল্য, খেলা ছেড়ে দেয়ার পর কর্মকর্তা, কোচ, আম্পায়ার, রেফারিংয়ে করার সংখ্যাও কম এবং সরকারের তাদের নিয়ে কোনো পরিকল্পনা এ সব নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন হয়। এই প্রতিবেদনটি দেশে দু’টি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। এআইপিএস মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে ‘প্রমোটিং ডাইভারসিটি এন্ড ইনক্লুসেভনেস ইন স্পোর্টস’ হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছিল ২০২৪ সালে।

বিশেষ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাড়াও সাধারণ অনেক প্রতিবেদনেরও থাকে অনেক গল্প। কখনো ছোট রিপোর্টের নেপথ্যের গল্পও বড়। সেটা না হয় অন্য কোনো এক সময় বলা হবে।

ফুটবল ফেডারেশন এখন মতিঝিলের আরামবাগে। জাতীয় স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আংশিক অফিস রয়েছে। ফেডারেশনের কোন অফিসে কোন ট্রফি সেটা জানার চেষ্টা করলাম। তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগের কাছে সেই মুহুর্তে কোনো তালিকা ছিল না। কিছু দিন সময় নিয়ে তালিকা তৈরি করলেন। সেই তালিকায় নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই ট্রফি ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে চার জাতির চ্যাম্পিয়ন ও ঢাকায় ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নের ট্রফি। ঐতিহাসিক দুই ট্রফির হদিস নেই প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালে গ্লোবাল ইনভেস্টগেটিভ জার্নালিজমে মার্চ মাসের তালিকায় জায়গা পায়।

শৈশব-কৈশোর কেটেছে ক্রিকেট প্রেমে। বিশেষ করে লঙ্কান ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ভক্ত। খেলাকে ভালোবেসে খেলা নিয়ে লেখাকে পেশা হিসেবে নেওয়া। পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার পর ক্রিকেট নিয়ে লেখা হয় একেবারে কদাচিৎ। ফুটবল, জিমন্যাস্টিক্সসহ অন্য সকল খেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেক সম্পৃক্ততা ও সাফল্য। সেখানে ক্রিকেট এত জনপ্রিয় হওয়ার পরও খেলাটি যেতে পারেনি অনেকের কাছে। ‘পড়েনি ক্রিকেটের আলো’ প্রতিবেদনটি অত্যন্ত আলোচিত হয়। ভাষা, খাবার,পোষাক এত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনন্য সাফল্য,খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর কর্মকর্তা,কোচ,আম্পায়ার ও রেফারিংয়ে করার সংখ্যাও কম এবং সরকারের তাদের নিয়ে কোনো পরিকল্পনা এ সব নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন হয়। এই প্রতিবেদনটি দেশে দু’টি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। এআইপিএস মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে ‘প্রমোটিং ডাইভারসিটি এন্ড ইনক্লুসেভনেস ইন স্পোর্টস’ হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছিল ২০২৪ সালে।

বিশেষ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাড়াও সাধারণ অনেক প্রতিবেদনেরও থাকে অনেক গল্প। কখনো ছোট রিপোর্টের নেপথ্যের গল্পও বড়। সেটা না হয় অন্য কোনো এক সময় বলা হবে।