বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

মুরগির বাজারে আগুন—প্রোটিন এখন বিলাসিতা

প্রকাশিত হয়েছে- শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

রাজধানীর বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে মুরগির বাজার। যে মুরগি একসময় গরুর মাংসের বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করত, এখন সেটিই হয়ে উঠেছে অনেকের নাগালের বাইরে।

শনিবার (৪ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, গুলশান কাঁচাবাজার এবং রামপুরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে মুরগির দামে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। অন্যদিকে, সোনালি মুরগির দাম লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩০ টাকায়, যা একদিন আগেও ছিল ৩৯০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। আর দেশি মুরগি কিনতে গেলে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা কেজি—যা অনেকের জন্যই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ সংকটই এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। গুলশান কাঁচাবাজারের বিক্রেতা মাসুম জানান, “কয়েকদিন আগেও সোনালি মুরগি ৩৮০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন পাইকারিতেই দাম বেড়ে গেছে, তাই খুচরা বাজারে ৪০০ টাকার ওপরে বিক্রি করতে হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, দাম বাড়ার কারণে ক্রেতার সংখ্যাও কমে গেছে। যারা আগে সোনালি বা দেশি মুরগি কিনতেন, তারা এখন বাধ্য হয়ে ব্রয়লার মুরগির দিকে ঝুঁকছেন।

ক্রেতাদের ভোগান্তিও চোখে পড়ার মতো। রামপুরা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা রুহুল আমিন জানান, বাসায় অতিথি আসায় সোনালি মুরগি কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বেশি দামের কারণে শেষ পর্যন্ত ব্রয়লার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। “৪৩০ টাকা দিয়ে এক কেজি সোনালি মুরগি কেনার চেয়ে সেই টাকায় দুই কেজির বেশি ব্রয়লার পাওয়া যায়। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য এটাই বাস্তবতা,” বলেন তিনি।

নিয়মিত বাজার করা ৬০ বছর বয়সী মো. নওশের আলী মনে করেন, এখন মুরগির দাম অনেক ক্ষেত্রে গরুর মাংসের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। তার যুক্তি, এক কেজি মুরগি কিনে পরিষ্কার করার পর কার্যত ৭০০ গ্রামের মতো মাংস থাকে। অথচ একই টাকায় প্রায় আধা কেজির বেশি গরুর মাংস পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, “রোজার সময় যে সোনালি মুরগি ২৮০-৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, ঈদের পর তা বেড়ে ৪০০ টাকার ওপরে চলে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন। জোয়ার সাহারা এলাকার এক বিক্রেতা জানান, তার ২৫ বছরের ব্যবসায় এই প্রথম এত উচ্চ দামে সোনালি মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। “আগে কখনো ৩৫০-৩৬০ টাকার বেশি যায়নি, কিন্তু এখন ৪৩০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে—এটা রেকর্ড,” বলেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, খামার পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়া, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দিনগুলোতে প্রোটিনের এই সহজলভ্য উৎস আরও দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, মুরগির বাজারে এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।