বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

মান্দার সেই ‘বিতর্কিত’ ওসি মাসুদ রানা অবশেষে ক্লোজড: ১০ কোটির সাম্রাজ্য ও ‘রামরাজত্বের’ অবসান

প্রকাশিত হয়েছে- বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

মান্দার সেই ‘বিতর্কিত’ ওসি মাসুদ রানা অবশেষে ক্লোজড: ১০ কোটির সাম্রাজ্য ও ‘রামরাজত্বের’ অবসান

মাহবুবুজ্জামান সেতু,নওগাঁ প্রতিনিধি: অবশেষে অপসারিত হলেন নওগাঁর মান্দা থানার বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম মাসুদ রানা। জামায়াত ঘরানার পারিবারিক পরিচয় গোপন করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগে শেষ রক্ষা হলো না।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নওগাঁ পুলিশ লাইন্স ও.আর-হেডকোয়ার্টারে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই আদেশে মান্দা থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে নওগাঁ সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ খোরশেদ আলমকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে এসআই হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া পাবনার সুজানগর উপজেলার বাসিন্দা মাসুদ রানার উত্থান ছিল রূপকথার মতো। পাবনার সাথিয়া উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের শাহ জাহান আলীর মেয়েকে বিয়ে করেন তিনি। তার শ্বশুর ও পিতা সরাসরি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কৌশলে নিজেকে আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে জাহির করতেন তিনি। মাত্র ১৪ বছরের চাকরিতেই বগুড়া শহরের অভিজাত এলাকায় গড়ে তুলেছেন একাধিক প্লট ও বিলাসবহুল সম্পদ, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে থাকাকালীন জব্দকৃত ট্রাক থেকে ২৩ লাখ টাকার পাম অয়েল ‘গায়েব’ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মান্দা থানায় যোগদানের পর থেকেই মাসুদ রানার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি দক্ষিণ মৈনম হিন্দু পল্লীতে গভীর রাতে তেলের মজুত খোঁজার অজুহাতে ওসির নেতৃত্বে পুলিশের ভয়াবহ তাণ্ডবে এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, কোনো পরোয়ানা ছাড়াই গভীর রাতে ঘরে ঢুকে নারী ও শিশুদের গালিগালাজ এবং দরজায় লাথি মেরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন তিনি।

গত ২৯ মার্চ তেলের তীব্র সংকটের সময় শাপলা ফিলিং স্টেশনে সাধারণ বাইকারদের তেল না দিয়ে উচ্চমূল্যে কালোবাজারিতে মদদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়ক অবরোধ করলে ওসি মাসুদ রানা তাদের লাইসেন্স ও হেলমেটের অজুহাতে ধমক দিতে গিয়ে উল্টো তোপের মুখে পড়েন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থল থেকে তিনি কৌশলে সটকে পড়েন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসাহাসির সৃষ্টি হয়।

ওসি মাসুদ রানার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ হলো খুনের আসামিকে আড়াল করা। প্রসাদপুর কওমি মাদ্রাসার ছাত্র হত্যার ঘটনায় ঘাতক দায় স্বীকার করলেও মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাকে বাদ দিয়ে ‘অজ্ঞাত’ আসামিদের নামে মামলা নেওয়ার অভিযোগ করেন নিহতের স্বজনরা। এছাড়া গত ৭ মার্চ শ্রীরামপুর গ্রামে এক পরিবারের ওপর হামলার সময় ভুক্তভোগীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ বারবার কল দিলেও ওসির নির্দেশেই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে থানায় অভিযোগ করতে গেলে উল্টো ‘চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানোর’ হুমকির একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বদলীর আদেশপ্রাপ্ত ওসি কে এম মাসুদ রানা বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। আমি সবসময় সরকারি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। প্রশাসনিক কারণেই আমাকে বদলি করা হয়েছে, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।”

বিতর্কিত এই ওসির অপসারণের খবরে মান্দার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু ক্লোজড নয়, তার অবৈধ সম্পদের তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, জনস্বার্থে এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা বজায় রাখতেই এই রদবদল করা হয়েছে।