বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ময়লায় ঢেকে যাওয়া ভাষাসৈনিক বাবার নামফলক পরিষ্কার করলেন ছেলে

প্রকাশিত হয়েছে- শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়কের কেষ্টপুর স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা একটি নামফলক। ধুলো, ময়লা আর অবহেলার স্তরে প্রায় ঢেকে গিয়েছিল ইতিহাসের একটি নাম। যে নাম জড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় স্মৃতির সঙ্গে। পথচারীরা প্রতিদিন পাশ কাটিয়ে গেলেও, সেই নামফলকের দিকে তাকিয়ে এক সন্তানের চোখে ভেসে উঠেছে তার বাবার ত্যাগের গল্প। তাই কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, নিছক সন্তানের দায়বদ্ধতা থেকেই নিজ হাতে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে দেখা গেল কবি ও কলাম লেখক সাগর জামানকে।

যে নামফলকটি তিনি পরিষ্কার করছিলেন, সেটি তার বাবা, ভাষাসৈনিক এ কে এম হামিদুজ্জামান এহিয়ার স্মৃতির বাহক। ১৯৫২-এর উত্তাল দিনগুলোতে যিনি ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মাগুরা–ফরিদপুর মহাসড়কের কেষ্টপুর স্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত নামফলকের পাশে তাকে নিজ হাতে পরিষ্কার করতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় নামফলকটিতে ময়লা ও আবর্জনা জমে গিয়েছিল।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকাসহ সারাদেশে যখন গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন মাগুরায় সহপাঠীদের সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হামিদুজ্জামান এহিয়া। সে সময় তিনি শ্রীপুর উপজেলার নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিতে একপর্যায়ে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় যান এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ভাষা আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে ১৯৫৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বেলুচ আর্মড ফোর্স তাঁকে গ্রেফতার করে।

ভাষা আন্দোলনে তার গৌরবময় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালের ১৬ জুলাই তৎকালীন সরকার কেষ্টপুর স্ট্যান্ড থেকে শ্রীপুর উপজেলার নাকোল বাজার পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করেন তার নামে। একই বছরের ১৬ জুলাই সড়কের নামফলকটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সিরাজুল আকবর। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও মিউজিয়াম তাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করে।

নিজের বাবার স্মৃতিচিহ্ন দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকতে দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হয়ে সাগর জামান নিজ উদ্যোগে নামফলকটি পরিষ্কার করেন। তার এই উদ্যোগ স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এলাকাবাসীর অনেকেই বিষয়টিকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করে সড়কের নামফলকসহ ভাষা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ভাষা সৈনিক প্রয়াত এ কে এম হামিদুজ্জামান এহিয়া’র পুত্র সাগর জামান বলেন, ভাষা আন্দোলন এটি জাতির গৌরবের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নামফলক দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকতে দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। সন্তানের দায়বদ্ধতা থেকেই নিজ হাতে পরিষ্কার করেছি। তবে এটা শুধু আমার একার দায়িত্ব নয়—ভাষাসৈনিকদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন যত্নের সঙ্গে রক্ষা করা জরুরি।