মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা ও অবরোধের প্রভাবে এক মাসে অপরিশোধিত তেলের দাম, বিশেষ করে ব্রেন্ট ক্রুড, রেকর্ড ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ-এর পর এত অল্প সময়ে তেলের দামে এমন উল্লম্ফন আর দেখা যায়নি। তারা বলছেন, সরাসরি তেলের ঘাটতির কারণে নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি—যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও তরল গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ চলাচল করে। এই পথ ব্যবহার করে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানি করে থাকে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানায়, যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো—কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ—বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। কারণ এসব দেশের তেল রপ্তানির প্রধান পথই হরমুজ প্রণালি।
বিশ্লেষকরা জানান, এই সংকটের কারণে শুধু পারস্য উপসাগর নয়, বরং লোহিত সাগর এবং বাব আল মান্দেব প্রণালি-তেও ঝুঁকি বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে বিকল্প রুট হিসেবে সৌদি আরব তাদের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখলেও, তা বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের তেলসম্পদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে এবং প্রয়োজনে খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তার ভাষায়, “আমরা খার্গ দ্বীপের দখল নিতে পারি, আবার নাও নিতে পারি—আমাদের সামনে অনেক বিকল্প রয়েছে।”
খার্গ দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, সেখানে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব একটা নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সহজেই নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান-এর অর্থনীতি ব্যাপকভাবে জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। দেশটির মোট তেল মজুত প্রায় ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বৈশ্বিক মজুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
পারস্য উপসাগরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ ইরানের জ্বালানি রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। ফলে দ্বীপটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিদ্যমান সংকটের মধ্যে খার্গ দ্বীপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।