বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ভিন্ন ধর্মী নারী-যুবকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, ঝিনাইদহে তোলপাড়

প্রকাশিত হয়েছে- বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

ভিন্ন ধর্মী নারী-যুবকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, ঝিনাইদহে তোলপাড়
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে হিন্দু ধর্মের এক বিধবা নারীকে ধর্ষণ ও গাছে বেঁধে চুল কেটে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর ধর্ষণের অভিযোগ এনে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন ওই নারী। পরে মামলার এজাহারভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকেই বের হতে থাকে ভিন্ন খবর। এলাকাবাসীর দাবি মূল ঘটনা আড়াল করতেই ধর্ষণের নাটক সাজানো হয়েছে।

সরেজমিনে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়াসহ একাধিক ব্যক্তি সাথে কথা বললে তারা অভিযোগ করেন, ভিন্ন ধর্মের ওই নারীকে ধর্ষণ ও গাছে বেঁধে চুল কেটে নির্যাতনের যে অভিযোগ উঠেছে সেসব মিথ্যা। প্রকৃত ঘটনা হলো, গত শনিবার কোলা বাজার এলাকার সোহান ও ইমন নামে দুই ভিন্ন ধর্মের যুবক ওই নারীর বাসায় যায়। এ সময় অসামাজিক কার্যকলাপের সময় স্থানীয়রা তাদের ধরে ফেলে এবং গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে।

নারীসহ দুই যুবককে গাছে বেঁধে মারধর করার ওই ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়ে। যেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে এক ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী নিজে অপকর্মের টাকা ভাগাভাগির বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। কিন্তু আজ ওই নারী হিন্দু ধর্মের হওয়ায় বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে এটাকে ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে। যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাকে স্থানীয় মহিলারা কয়েকটি চড়থাপ্পড় মারলেও তাকে কেউ ধর্ষণ করেনি এবং কোন পুরুষ তাকে মারধর করেনি। এলাকাবাসীর দাবি, তিনি বাড়িতে ও বিভিন্ন জায়গায় অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকেন। নিজের অপকর্ম ঢাকতে মিথ্যা মামলা করেছেন। যদি ওই নারীকে কেউ ধর্ষণ করে তাহলে উভয়পক্ষের ডিএনএ টেস্টের দাবিও করেন এলাকাবাসী।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ভুক্তভোগী নারীর বাড়িতে থাকা ভাড়াটিয়া সুমি খাতুন বলেন, গত ৩১ ডিসেম্বর ওই নারীর বাড়িতে বহিরাগত দুই পুরুষ অবস্থান করছেন, এমন অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন ওই বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় ভুক্তভোগী নারীর ঘর থেকে দুজন তরুণ যুবককে আটক করে স্থানীয়রা। পরে উত্তেজিত জনতা ওই নারীর কাছে দুই তরুণের পরিচয় জানতে চায়। ওই নারী দুই তরুণকে তার আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দেন। এ সময় স্থানীয় শাহিন ও হাসান সহ অন্যান্যরা আটক দুই তরুণ যুবককে তাদের পরিচয় দিতে বললে তারা একেক সময় একেক রকম কথা বলতে শুরু করে। এ নিয়ে এক পর্যায়ে স্থানীয়রা তাদের মাঝে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বাড়ির বাইরে বের করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে।

ভুক্তভোগী নারীর প্রতিবেশী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মেহেদী হাসান জুয়েল বলেন, বাড়ির সামনে গাছের সঙ্গে ওই নারীসহ দুই তরুণ যুবককে বেঁধে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে উত্তেজিত স্থানীয় মহল্লার লোকজন। এ সময় কেউ কেউ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। এক পর্যায়ে স্থানীয়রা ওই দুই তরুণকে মারধর করেন। এ সময় ওই নারীকে স্থানীয় লোকজন চড়থাপ্পড় দেন।

ভুক্তভোগীর প্রতিবেশী আরেক নারী আয়েশা বেগম বলেন, ঘটনা ঘটলো একরকম। ইন্টারনেটে দেখছি আরেক রকম। মেয়েলোকটারে খুব মেরেছে। তবে কোনও পুরুষ মানুষ তাকে মারেনি। দু-একটা চড় থাপ্পড় যা মারার, মহিলারাই মেরেছে। এখন একজনের বাড়িতে কে আসছে আর কে যাচ্ছে, তা আমরা দেখলেও তো বলতে পারি না। বলা ঠিকও না। তবে সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ওই মহিলা হিন্দু আর সে দুই ছেলের পরিচয় দিয়েছে তারা মুসলিম। ওই দুই ছেলে স্বীকার করেছে তারা ১৫০০ টাকার বিনিময়ে তার বাসায় এসেছে।

আড়পাড়া নদীরপাড় গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ঘটনার দিন আমি শহরে ছিলাম। থানা থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হলো, আপনার গ্রামে একটা মেয়েলি ঝামেলা হচ্ছে, গিয়ে মীমাংসা করে দেন। আমি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, ওই নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। পরে গ্রামের মুরুব্বিরা এসে ওই নারীকে সতর্ক করে তার বাঁধন খুলে দেয়। আটক অপর দুই তরুণকেও ছেড়ে দেয়। ঘটনা ৩১ তারিখের। পরে শুনছি, ওই নারী এখন গ্রামের চার জনের নামে ধর্ষণের মামলা দিয়েছে। গ্রামের লোকজন মিথ্যা অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার ঘটনায় প্রতিবাদ করার জন্য গতকাল (৬ জানুয়ারি) মানববন্ধন করতে গেলেও পুলিশ আমাদের কর্মসূচি করতে দেয়নি।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভাই, আমি এখন খুব অসুস্থ। কথা বলতে পারছিনা। কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কালীগঞ্জ থানায় আছি। আর কোনও কথা বলতে পারছিনা।

ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ ডিসেম্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে ভুক্তভোগী নারী পরদিন ১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যান। এরপর ৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তিনি আবারও ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের গাইনী বিভাগে ভর্তি হন। এ সময় কালীগঞ্জ থানার নারী পুলিশ সদস্যসহ একাধিক পুলিশ সদস্য ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে ছিলেন। পরে ধর্ষণের নমুনা প্রদান ও শারীরিক পরীক্ষা শেষে ভুক্তভোগী নারী পুলিশসহ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান।

ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কালীগঞ্জের এক নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানি। তিনি গতকালই (৫ জানুয়ারি) হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। এরপরে আর কি হয়েছে, তা জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানাবো।

কালীগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন। আমরা মামলা রেকর্ড করেছি। মামলার এজাহারভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এ ঘটনায় যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।