মানুষের মন বড় বিচিত্র। সে জ্যামিতিক হারে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু প্রাপ্তি আসে গাণিতিক হারে। নির্বাচনের সময় এ ব্যবধান যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সামনে ভোট—চারদিকে সাজ সাজ রব। চায়ের দোকান থেকে টেলিভিশন স্টুডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাড়ার আড্ডা—সবখানে চলছে আসন-গণিতের হিসাব।
কেউ বলছে একটি দল ১৮০–১৯০ আসন পাবে, কেউ বলছে অন্য জোট ৯০–১০০ আসনে চমক দেখাবে। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফলের আগে এই অঙ্ক কেবল অনুমানই। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—এই হিসাবের ভেতরে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার জায়গাটা কোথায়?
ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বেকার তরুণ কি আসন বিন্যাসের অঙ্ক কষে? সে ভাবে চাকরির কথা। ভাবে, নতুন সরকার কি তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে? মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা ভাবেন বাজারদর, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ব্যয়—এগুলো কমবে কি না। তাদের ভোট আসলে প্রত্যাশার এক নীরব ভাষা।
নির্বাচিতদের জন্য এই বার্তাটি স্পষ্ট হওয়া উচিত—ম্যান্ডেট মানে শুধু ক্ষমতায় বসা নয়; এটি মানুষের জমে থাকা অভিমান ও আস্থার ভার বহন করা। অর্থনীতি যখন চাপে, কর্মসংস্থান যখন অনিশ্চিত, তখন সরকারের প্রথম দায়িত্ব হয় আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
কর্মসংস্থান একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে। হাতে কাজ থাকলে মানুষ আশাবাদী হয়, পরিবারে স্থিতি আসে। তাই ‘ব্যালট বিপ্লব’ তখনই সার্থক হবে, যখন তরুণদের চোখে হতাশার ছায়া কমবে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি অগ্রাধিকার জরুরি—
১. উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ:
তরুণদের শুধু সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় আটকে না রেখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) গড়তে উৎসাহ দিতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং কর-সহায়তা উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।
২. বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ:
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। বিশেষ করে আইটি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কর্মসংস্থানের বড় উৎস হতে পারে।
৩. দক্ষতা উন্নয়ন:
কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার সময়ের দাবি। ‘ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ কর্মসূচিকে যুগোপযোগী করে শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ভোট কেবল আসনের হিসাব নয়; এটি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, বেকার যুবকের দীর্ঘশ্বাস, বৃদ্ধ পিতার ওষুধ কেনার আকাঙ্ক্ষা। নতুন সরকার যদি কাজের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, অর্থনীতিকে চাঙা করে এবং তরুণদের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে—তবেই বলা যাবে, ভোটের অঙ্ক মিলেছে মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে।