বুধবার , ১লা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - বর্ষাকাল || ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা যেন রাজবাড়ী শহরের গলার কাঁটা

প্রকাশিত হয়েছে- মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

রাজবাড়ী জেলা শহর ও মহাসড়কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা। এতে শহরের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে শহরবাসী।

নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করেই সর্বত্র দাপিয়ে বেড়ানো এসব যানবাহনের কারণে সড়কের ওপর যেমন বাড়ছে চাপ, তেমনি যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ে রাজবাড়ী শহরে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এছাড়াও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় বিদ্যুতের ওপর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অদক্ষ চালক ও পৌর শহরের ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ অটোরিকশা চলাচল করায় তীব্র যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছে শহরবাসী। ইজিবাইক ও অটোরিকশা এখন শহরবাসীর কাছে বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি সড়ক ও মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ইজিবাইক। পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোও দিনরাত দখল করে রাখছে অনুমোদনহীন এসব বাহন। ইজিবাইক ও অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে শহরে দেখা দিচ্ছে যানজট। যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকে। বিশেষ করে শহরের শ্রীপুর বাজার, বড়পুল, নতুন বাজার, অংকুর কলেজিয়েট স্কুল, আদর্শ মহিলা কলেজ, পান্না চত্বর, রেলগেট ও বড় বাজারে ইজিবাইক ও অটো রিকশার জন্য সবসময় যানজট লেগেই থাকছে। অটোরিকশার চাপের কারণে বড় বাজারের ৫ তলা থেকে রেলগেট পার হতেই সময় লাগছে আধাঘণ্টার বেশি। এছাড়াও স্কুল কলেজ ছুটি হবার মুহূর্তেই ইজিবাইক ও রিকশাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অবস্থান করায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।

রাজবাড়ী পৌরসভার তথ্য মতে, পৌরসভা এলাকায় প্রায় ৪ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক প্রতিদিন চলাচল করে থাকে। এখন পর্যন্ত পৌরসভা প্রায় ১৬শ’টি ইজিবাইক নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্যে এসেছে। পৌরসভা থেকে ২ হাজার ইজিবাইককে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার টার্গেট নিয়েছে। তবে বিভিন্ন উপজেলা থেকে পৌরসভার মধ্যে ৫ থেকে ৬ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক প্রতিদিন আসে। এছাড়াও উপজেলা পর্যায় থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার ইজিবাইক পৌর এলাকায় প্রবেশ করে।

অন্যদিকে, রাজবাড়ী পৌরসভার নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে ১ হাজার ৭৩৩টি। নিবন্ধন ছাড়াও আরও দুই/তিন হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা পৌরসভার মধ্যে চলাচল করে থাকে। তবে, জেলা ট্রাফিক পুলিশের কাছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার সংখ্যার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

রাজবাড়ী জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ বছরে জেলায় ৩৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯ জন মারা গেছে এবং ৪১ জন আহত হয়েছে। এর বেশির ভাগই দুর্ঘটনা ঘটেছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের মাধ্যমে।

বিআরটিএ রাজবাড়ী সার্কেলের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে জেলায় মোট ৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে নিহত হয়েছে ৫২ জন এবং আহত হয়েছে ৭৫ জন। আহত ৭৫ জনের মধ্যে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার মাধ্যমে ঘটেছে।

একটি বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ীতে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলাচল করে। যা চার্জ দিতে প্রতিদিন প্রায় ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয় এবং এই চার্জ দেওয়ার ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

রাজবাড়ী পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী খান লিখন ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাত্র পৌরসভা থেকেই ইজিবাইক ও রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়ে থাকে। পৌরসভার নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা রয়েছে ১৭৩৩ এবং নিবন্ধিত ইজিবাইক ২ হাজার। তবে এর বাইরেও উপজেলা পর্যায় থেকে আরও ইজিবাইক ও অটোরিকশা পৌরসভার মধ্যে এসে চলাচল করে থাকে। যাদের কোনো নিবন্ধন নেই। যার ফলে পৌর শহরে যানজট সৃষ্টি হয়।

রাজবাড়ী ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন-অর-রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, রিকশা ও ভ্যান চার্জ দেওয়ার ফলে বিদ্যুতের ওপর কোন প্রভাব পড়ছে না। কারণ যারা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা চার্জ দিচ্ছে তাদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরির মিটার রয়েছে। সরকার তাদের জন্য আলাদা ট্যারিফ ও চার্জ নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এগুলো চার্জ দেওয়ার ফলে কোনো প্রভাব পড়ছে না।

তিনি আরও বলেন, অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা চার্জ দেওয়ার এমন কোনো সংবাদ আমাদের কাছে নেই। তবে যদি এমন কোনো সংবাদ আমরা পাই তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাজবাড়ী শহরের বাসিন্দা মিরাজুল মাজিদ তূর্য বলেন, রাজবাড়ী পৌরবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশাগুলো। এদের দৌরাত্ম্যের কারণে শহরবাসী ঠিকমত চলাফেরা করতে পারছে না। বাজার থেকে রেলগেট পার হতে গেলেই সময় লাগছে আধাঘণ্টা। আমরা শহরে চলাচলের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ চাই।

কয়েকজন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশাচালক ঢাকা পোস্টকে বলেন, শহরে আমাদের পার্কিং এর জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান নেই। যার কারণে যত্রতত্রভাবে বিভিন্ন জায়গায় গাড়িগুলো পার্কিং করা হয়। এজন্য যানজটের সৃষ্টি হয়। নির্দিষ্ট কোন পার্কিং এর জায়গা থাকলে যানজটের পরিমাণ কমে যেতো। এছাড়াও উপজেলা থেকে কিছু ইজিবাইক ও রিকশা শহরে এসেও যানজট সৃষ্টি করে। এগুলো আসা সীমিত হলে যানজট অনেকাংশেই কমে যেতো।

রাজবাড়ী নাগরিক কমিটির সভাপতি জ্যোতি শঙ্কর ঝন্টু ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাজবাড়ী শহরটা অত্যন্ত ছোট শহর। এই ছোট শহরে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা সংখ্যার দিক দিয়ে যে পরিমাণে থাকা দরকার তার থেকে কয়েকগুণ বেশি রয়েছে। এতে শহরবাসীর চলাচল ও জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সেই কারণে আমি মনে করি, প্রশাসনিকভাবে ও পৌরসভা কর্তৃক এই অটোরিকশাগুলোর স্ট্যান্ড কোথায় করা যায়, যাতে যানজটের সৃষ্টি না হয় সেটি বিবেচনা করা। প্রশাসন এবং পৌরসভার উচিত এই যানবাহনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক তত্ত্বাবধান করা।

রাজবাড়ী জেলা ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) আতাউর রহমান বলেন, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা বৃদ্ধির কারণে শহরে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। অদক্ষ চালক ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ না করলে যানজটের ভোগান্তি কমানো সম্ভব নয়। অবৈধভাবে পার্কিং করলে আমরা মাঝেমধ্যে তাদের মামলা দেই। কিন্তু অনেক সময় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের মামলা দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ বেশিরভাগ চালক দরিদ্র শ্রেণির। তবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শহরের রাস্তার ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী অটোরিকশার চলাচলের ব্যবস্থা করলে যানজট ও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।