জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যবসায়ী সমাজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। তহবিলের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি এবং লাল ফিতার জটিলতা—এই চারটি বিষয় ব্যবসা ও শিল্প খাতের বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেন ব্যবসায়ীরা, তাই তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শতাধিক ব্যবসায়ী ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আপনারা ব্যবসার মাধ্যমে মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করেন। রাষ্ট্র যদি আপনাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যবসা ও শিল্পকে শিশুর মতো আগলে রাখতে হবে।” তিনি ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তারা সরকার গঠন করলে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার আহ্বান জানানো হবে। সম্মানের সঙ্গে কেউ সেই অর্থ ফিরিয়ে দিলে রাষ্ট্র তার মর্যাদা আরও বাড়াবে। এর উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং দেশের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, এই দুই খাত একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার—উভয় খাতকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। একসময় দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তীতে ধারাবাহিক সংকটে পড়ে ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজার।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ ব্যাংকে আমানত রাখলেও তাদের অধিকাংশের উদ্যোক্তা হওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সেই আমানতের অর্থ এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিনিয়োগ করা হয়, যাদের ব্যবসা পরিচালনার যোগ্যতা রয়েছে। এই বিনিয়োগ বাণিজ্য ও শিল্প—উভয় খাতেই ব্যবহৃত হয়।
দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনটি খাতকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। মানবসম্পদের যথাযথ বিকাশ না হলে কোনো শিল্প বা ব্যবসা টেকসই হতে পারে না। মানুষের মেধা, যোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও পরিশ্রম—এই চারটির সমন্বয় ঘটলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন না।
ব্যবসায়িক সফলতার জন্য চারটি মৌলিক বিষয় অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সৎ নিয়ত, সংশ্লিষ্ট ব্যবসা সম্পর্কে জ্ঞান ও কারিগরি ধারণা, সংকটে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস এবং মালিক হিসেবে সরাসরি কাজে যুক্ত থাকা—এই গুণগুলো থাকতে হবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের শীর্ষ ২৭ জন ব্যবসায়ীর ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ২১ জনেরই পারিবারিক কোনো বড় পুঁজি ছিল না। তারা ক্ষুদ্র পুঁজি, সততা ও সাহস নিয়ে নিজেদের কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে সফল হয়েছেন।
নিজের ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, তিনি কখনো কর্মীদের প্রকাশ্যে অপমান করেননি বা বেতন কেটে শাস্তি দেননি। বরং আন্তরিক আচরণ ও সংশোধনের সুযোগ দিয়েই কাজ আদায় করেছেন। নারীকর্মীদের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় শালীনতা ও সম্মান বজায় রেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা পাশে বসে সেই যাত্রা উপভোগ করতে চান। একই সঙ্গে নারীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মায়েদের অবদান ও সম্মান রাষ্ট্র ও সমাজে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি।